Loading..

ব্লগ

রিসেট

০৭ এপ্রিল, ২০২৬ ০৭:৪৯ অপরাহ্ণ

সাঁওতাল জীবনের ছন্দময় রূপগাথা: ঐতিহ্যের ঝুমুর নাচ

বাংলাদেশের উত্তর-পশ্চিমাঞ্চলের লাল মাটি আর আদিম অরণ্যের ঘ্রাণে বেড়ে ওঠা এক লড়াকু নৃগোষ্ঠীর নাম সাঁওতাল। তাঁদের জীবনের পরতে পরতে মিশে আছে প্রকৃতি আর মাটির সাথে সখ্য। এই সখ্যের সবচেয়ে জীবন্ত এবং শৈল্পিক বহিঃপ্রকাশ হলো তাঁদের ঐতিহ্যবাহী ঝুমুর নাচ। এটি কেবল পায়ের ছন্দে কোনো শারীরিক কসরত নয়, বরং সাঁওতালদের আনন্দ, বেদনা, যূথবদ্ধ জীবন আর উৎসবের এক প্রাণবন্ত মহাকাব্য। ধামসা আর মাদলের গুরুগম্ভীর শব্দ যখন শান্ত সাঁওতাল পল্লীর নীরবতা ভাঙে, তখন সেই সুরের মূর্ছনায় যেন স্পন্দিত হয় কয়েক হাজার বছরের পুরনো এক সংস্কৃতি।

ঝুমুর নাচের প্রধান সৌন্দর্য লুকিয়ে আছে এর সম্মিলিত অংশগ্রহণের মধ্যে। সাধারণত গ্রামের নারী-পুরুষ সবাই মিলে এই উৎসবে মেতে ওঠেন। সাঁওতাল মেয়েরা রঙিন শাড়ি পরে একে অপরের কোমর বা হাত ধরে সারিবদ্ধভাবে লীন হয়ে যান ছন্দের দোলায়। তাঁদের মাথায় গোঁজা বুনো ফুল আর কানে-গলায় ঝিলিক দেওয়া পিতলের অলঙ্কার এক মায়াবী পরিবেশ তৈরি করে। নাচের তালে তালে যখন পায়ের নুপুর আর হাতের বালা বেজে ওঠে, তখন মনে হয় যেন স্বয়ং প্রকৃতি তাঁর সন্তানদের সাথে উৎসবে মেতেছে। এই নাচের ভঙ্গি অত্যন্ত সাবলীল, যা মূলত দৈনন্দিন জীবনের নানা কর্মকাণ্ড যেমন ফসল কাটা বা নতুন ঋতুকে স্বাগত জানানোর প্রতীক হিসেবে কাজ করে।

এই সাংস্কৃতিক যজ্ঞের প্রাণভোমরা হলো তাঁদের নিজস্ব বাদ্যযন্ত্র। মাদল, ধামসা, বাঁশি আর করতাল ছাড়া ঝুমুর নাচ যেন অসম্পূর্ণ। এই বাদ্যযন্ত্রগুলোর প্রতিটি আঘাতের সাথে মিশে থাকে সাঁওতালদের বীরত্ব আর ঐতিহ্যের গল্প। সোহরাই বা বাহা উৎসবের রাতে যখন আগুনের চারপাশে গোল হয়ে তাঁরা এই নাচ পরিবেশন করেন, তখন তা কেবল একটি পরিবেশনা থাকে না, বরং এক পবিত্র আচার হয়ে দাঁড়ায়। প্রজন্মের পর প্রজন্ম ধরে এই শিল্প তাঁদের ইতিহাসের সাক্ষী হয়ে আছে। আধুনিকতার প্রবল স্রোতেও ঝুমুর নাচ তার স্বকীয়তা হারায়নি, বরং আজও তা আমাদের জাতীয় লোকসংস্কৃতিকে এক অনন্য উচ্চতায় নিয়ে যাচ্ছে। এই ধ্রুপদী লোকগাথা আমাদের মনে করিয়ে দেয় যে, শেকড়ের টানেই জীবনের প্রকৃত সার্থকতা লুকিয়ে আছে।

মন্তব্য করুন

ব্লগ