সিনিয়র শিক্ষক
০৭ এপ্রিল, ২০২৬ ০১:৩৩ অপরাহ্ণ
একটি নদীর আত্মকথা: একটি মহাকাব্যের অবসান ও প্রলয়ের হাতছানি
একটি নদীর আত্মকথা:
একটি মহাকাব্যের অবসান ও প্রলয়ের হাতছানি
আমি নদী। আমার জন্ম হয়েছিল উচ্চ হিমালয়ের তুষারশুভ্র চূড়ায়—যেখানে মেঘ আর বাতাসের অবিরাম মিতালি চলে অবিরাম। গভীর অরণ্যের নিবিড় মমতায়, যখন বৃক্ষরাজির শেকড় মাটির গহিন থেকে প্রাণের রসদ শুষে নিত, তখন সেই সিক্ত মাটির ঘাম হয়ে আমি ঝরে পড়েছিলাম। এক ফোঁটা, দুই ফোঁটা—হাজারো ফোঁটার অস্ফুট গুঞ্জন থেকে জন্ম নিয়েছিল আমার অবাধ্য শৈশব। পাথরের বুকে নূপুরের শব্দ তুলে, পাহাড়ের খাড়া ঢাল বেয়ে নেমে আসতাম আমি, তখন আমি ছিলাম এক চঞ্চলা কিশোরী। আমার শীতল স্বচ্ছ শরীরে তখন কেবল পাহাড়ের স্মৃতি আর বনের গভীর সুবাস মিশে থাকত।
তারপর সমতলে এসে আমি পূর্ণযৌবনা হলাম। আমার গতি শান্ত হলো, কিন্তু গভীরতা বাড়ল অপরিসীম। আমি বয়ে আনলাম উর্বর পলি, বয়ে আনলাম জীবনের মিষ্টি ঘ্রাণ। আমার দুই তীরে মানুষ গড়ল ঘরবাড়ি, জ্বেলে দিল সভ্যতার প্রদীপ। আমি তাদের মা হলাম, অন্নদাত্রী হলাম, জীবনদাত্রী হলাম। কেউ আমায় ডাকল ‘মা’, কেউ বা ‘জীবনরেখা’, কেউ বা ‘প্রাণের ধারা’।
আমার কলতানে মুখরিত হতো পল্লীবধূর কলসিকাখার মিষ্টি শব্দ, আর আমার বুকে ভেসে বেড়াত মাঝির ভাটিয়ালি গানের সুর। বর্ষায় আমি ফুলে উঠতাম উদ্ধত হয়ে, আবার শুষ্ক মৌসুমে সরু হয়ে গিয়ে তাদের তৃষ্ণা মেটাতাম অকাতরে। আমার বুকে মাছের ঝাঁক খেলা করতো অবাধে, পাখিরা আমার পাড়ে বাসা বাঁধতো নির্ভয়ে, আর শিশুরা আমার জলে পা ভিজিয়ে হাসতো নির্মল আনন্দে। কিশোরী-তরুণীরা চৈত্রের দুপুরে আমার বুকে সাঁতার কাটতো, কেউবা যোগাড় করতো রাতের আহারীয় শক্তি।
গ্রাম্য বধূ গাঙের নাওয়ের মাঝিকে ডাক দিয়ে বলতো, তার ভাই যেন নাইয়ুর নিবার আসে। আর তার ভাই আসতো পাল তোলা নাও বাইয়া, বুকভরা আশা নিয়ে।
কিন্তু সময় পাল্টে গেল নির্মমভাবে। যেই মানুষগুলো আমার স্নেহে বেড়ে উঠল, তারাই আজ আমার অস্তিত্বের মূলে কুঠারাঘাত করছে নির্দয়ভাবে। পাহাড় আজ বৃক্ষশূন্য, ধূসর আর রুক্ষ। সেই শেকড়গুলো আজ আর জল ধরে রাখে না—আমায় প্রাণ দেওয়ার মতো সেই মমতা আজ প্রকৃতির বুক থেকে চিরতরে হারিয়ে গেছে।
পানির অভাব আজ আমার প্রতিটি বাঁকে, প্রতিটি শিরায়। আমার যে বুক একসময় টলটলে যৌবনে ভরপুর ছিল, আজ সেখানে খাঁ খাঁ করছে তপ্ত বালুচরের প্রান্তর। আমার ধমনিতে আজ আর নতুন রক্তের সঞ্চার হয় না। বৃষ্টির অপেক্ষায় চাতক পাখির মতো চেয়ে থাকি আমি, কিন্তু মেঘেরা আজ দিকভ্রান্ত, বিপথগামী।
স্রোত আর বহে না। যে চপলতা ছিল আমার ভূষণ, তা আজ স্থবিরতায় পর্যবসিত হয়েছে। প্রাণের সেই স্পন্দন আজ নিথর, নীরব। আমার শরীরে এখন আর ঢেউ ওঠে না, কেবল জমাটবদ্ধ গ্লানি আর পঙ্কিলতা আমাকে ঘিরে ধরেছে চারপাশ থেকে। আমি আস্তে আস্তে শুকাই, মরে যাই। আমার পাড়গুলো ভেঙে পড়ে অভিমানে, আমার গর্ভের মাছেরা শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করে বিষাক্ত জঠরে। আমার সেই অন্তহীন পথচলা, সমুদ্রের সাথে মিতালি করার আজন্ম তৃষ্ণা—সবই আজ মরীচিকা মাত্র।
আমার গতি থেমে যায় চিরতরে। আমি আর বইতে পারি না। পাথর আর পলিমাটির ভারে আমার হৃৎপিণ্ড আজ অবরুদ্ধ, নিষ্প্রাণ। এখন আমি মৃত। আমার কলকল ধ্বনি আজ কবরের নীরবতায় ঢাকা পড়েছে সম্পূর্ণ। আমি এখন এক শীর্ণ কঙ্কাল, যার ওপর দিয়ে বয়ে যায় শুষ্ক তপ্ত হাওয়ার দীর্ঘশ্বাস।
মৃত্যুর পরেও আমার নিস্তার নেই। তারপর আমার ওপর শুরু হয় নির্মম নির্যাতনের নতুন অধ্যায়। আমার নিথর দেহের ওপর নির্দয়ভাবে তোলা হয় বাঁধ—যেন শেষ অবশেষটুকুও শুষে নেওয়া যায় নিঃশেষে। চারপাশ থেকে চলে ভরাট করার মহোৎসব; আমার বুক চিরে গড়ে ওঠে অট্টালিকা আর ইট-পাথরের জঙ্গল। সেখানে চলে লাঙলের নিষ্ঠুর চাষ; যে বুকে ঢেউয়ের তালে খেলা করতো মতস্যকন্যারা, সেখানে আজ ধুলো উড়ে, মৃত্যুর ছায়া নামে।
এখন কেউ কেউ বলে, আমাকে খনন করবে। বোকারা জানে না—খননে আমার প্রাণ ফিরে না কখনো। প্রাণ ফিরে শুধু ঘন বনে, শুধু প্রকৃতির কোলে। আমাকে খনন করে কষ্ট দিও না, নিও না আর। প্রাগৈতিহাসিক কালে আমাকে কে খনন করেছিল? কেউ না। সেই অসীম সময়ে, যখন পৃথিবী নিজেকে গড়ছিল, তখন আমি নিজেই নিজেকে খনন করেছিলাম। বৃষ্টির ফোঁটা, তুষারের গলা জল, পাহাড়ের ঢাল বেয়ে নামা স্রোত—সব মিলে আমি নিজের পথ কেটে নিয়েছিলাম অবিরাম। পাথর ক্ষয় করে, মাটি সরিয়ে, নিজের অবাধ্য গতিতে আমি উপত্যকা তৈরি করেছিলাম, গিরিখাত খনন করেছিলাম। আমার প্রাণ ছিল প্রকৃতির দানে—ঘন বনের শেকড়ে, মেঘের বৃষ্টিতে, পাহাড়ের তুষারে।
মানুষের খননযন্ত্র আমাকে শুধু ক্ষতবিক্ষত করবে, আমার দেহের শিরা-উপশিরা ছিন্নভিন্ন করে দেবে নিষ্ঠুরভাবে। আমাকে প্রাণ দাও—আমি নিজেই নিজেকে খনন করে নেব আবার। ঘন বন ফিরিয়ে দাও, পাহাড়ের চূড়ায় গাছ লাগাও, শেকড়কে মাটির গভীরে ফিরিয়ে দাও; তাহলেই আমার স্রোত আবার জেগে উঠবে, আমার বুকে আবার ঢেউ খেলবে উন্মত্ততায়।
কিন্তু শোনো হে মানুষ! এই পরিণতি শুধু আমার নয়, এ তোমাদেরও। আমি যখন শুকিয়ে মরি, তখন প্রকৃতির অভিশাপ তোমাদের দরজায় কড়া নাড়ে নির্মমভাবে। আমি যখন নিথর হই, তখন তোমাদের ভূগর্ভের জলস্তর পাতালে গিয়ে লুকায় চিরতরে। তৃষ্ণায় যখন তোমাদের মাটি ফেটে চৌচির হবে, তখন বুঝবে নদী কেবল জল ছিল না—সে ছিল তোমাদের প্রাণবায়ু, তোমাদের অস্তিত্বের শেষ আশ্রয়। আমার এই বিনাশ আসলে তোমাদেরই বিনাশের পূর্বাভাস, তোমাদেরই ধ্বংসের সূচনা।
আমার স্মৃতিতে এখন কেবল দাহকালের ছায়া। যেখানে একসময় সহস্র ঝিরি এসে আমার সঙ্গে আলিঙ্গন করতো, সেখানে আজ শুধু শুষ্ক খালের কঙ্কাল পড়ে আছে। সেই সহযাত্রীরা আজ আর আসে না। তারা পথিমধ্যেই হারিয়ে গেছে—মানুষের তৈরি সিমেন্টের খাঁচায়, কিংবা কোনো দখলদারের মাটির নিচে দমবন্ধ হয়ে। আমি একা পড়ে আছি নিঃসঙ্গ। আমার দুই তীরে আজ আর কাশবন দোলে না, সেখানে এখন শকুনের মতো ওড়ে প্লাস্টিকের নিশান, বিষাক্ত ধ্বংসের চিহ্ন।
আমার বক্ষ চিরে তোমরা যে চাষাবাদ করো—সেখানে কি ধানের মিষ্টি ঘ্রাণ পাও? নাকি পাও আমার পচাগলা লাশের গন্ধ? যে লাঙল আমার বুক চিরে দাগ কাটে, জেনে রেখো—সেই প্রতিটি রেখা আসলে তোমাদেরই কফিনের পেরেক, তোমাদেরই সমাধির চিহ্ন। তোমরা আজ আমার তলায় ঘর তোলো, শহর বানাও। তোমরা ভুলে গেছো—আমি যখন ছিলাম, তখন আমি ছিলাম তোমাদের রক্ষাকবচ। আমি জল ধরে রাখতাম, ভূগর্ভের অতল গহ্বরকে কানায় কানায় পূর্ণ রাখতাম। আজ আমি নেই, তাই তোমাদের পাতাল শূন্য। তোমাদের কল থেকে আজ আর পানি ওঠে না, ওঠে শুধু দীর্ঘশ্বাস আর হাহাকার।
আমি আজ ইতিহাসহীন এক ধূসর রেখা। মানচিত্রের বুক থেকে আমার নাম মুছে গেছে চিরতরে। কোনো এককালে যেখানে স্টিমারের বাঁশি বাজতো, সেখানে আজ ধুলো উড়িয়ে দাপিয়ে বেড়ায় দানবীয় ট্রাক।
আমার বুকে আজ কোনো শিশুর পা ভেজে না, আমার ঘাটে কোনো বধূ তার চোখের জল বিসর্জন দেয় না। আমি আজ পরিত্যক্ত এক নর্দমা—যেখানে তোমরা তোমাদের পাপ আর বর্জ্য ফেলে তৃপ্তির ঢেঁকুর তোলো নির্লজ্জভাবে।
কিন্তু সাবধান, হে দু’পেয়ে জন্তুরা! তোমরা ভেবেছো, আমাকে মেরে ফেলে তোমরা বিজয়ী হয়েছ? তোমরা কি শোনোনি—প্রকৃতি কখনো কারো ধার রাখে না? আমি যখন শুকাই, তখন শুধু আমি শুকাই না; তোমাদের চোখের জলও শুকিয়ে যায় চিরতরে। তোমাদের হৃদয় হয়ে ওঠে পাথরের মতো রুক্ষ, নির্জীব। তোমরা আজ অর্থের চাষ করছো, কিন্তু ক্ষুধার দিনে কি সেই নোট চিবিয়ে খাবে? তৃষ্ণার দিনে কি সোনা গলিয়ে পান করবে?
মরুভূমি আজ তোমাদের দরজায় কড়া নাড়ছে নীরবে। আমি যখন প্রবাহিত ছিলাম, তখন আমি ছিলাম এক শীতল দেয়াল—যা উত্তপ্ত মরুকে দূরে সরিয়ে রাখতো। আজ আমি নেই। উত্তপ্ত লুহাওয়া এখন তোমাদের অন্দরমহলে প্রবেশ করবে নির্ভয়ে। তোমাদের সাজানো বাগান শুকিয়ে ছাই হবে, তোমাদের দামি অট্টালিকার দেয়ালে ধরবে নোনা ধরা ফাটল, ধ্বংসের চিহ্ন।
পরিণতি এবার তোমাদের দিকে ধেয়ে আসছে অপ্রতিরোধ্য গতিতে। আমি নদী, আমি ছিলাম বহমান। আমার ধর্ম ছিল দেওয়া। আমি তোমাদের জীবন দিয়েছি, অন্ন দিয়েছি, গান দিয়েছি, আশা দিয়েছি। আর বিনিময়ে তোমরা আমাকে দিয়েছ বিষ, পাথর, মৃত্যু আর অভিশাপ।
এখন আমি নীরব। আমার কোনো শব্দ নেই, কলতান নেই। কিন্তু এই নীরবতাই সবচেয়ে ভয়ংকর। কারণ, যখন কোনো দেশ বা সভ্যতার নদী মরে যায়, তখন সেই সভ্যতার ইতিহাস বালিতে চাপা পড়ে যায় চিরকালের জন্য।
কয়েক দশক পর, তোমাদের উত্তরসূরিরা যখন তৃষ্ণায় ধুঁকতে ধুঁকতে মাটির তলায় এক ফোঁটা জলের সন্ধান করবে, তখন তারা খুঁজে পাবে শুধু হাড় আর শুকনো বালু।
তোমাদের তৃষ্ণা মেটানোর মতো এক ফোঁটা অশ্রুও কি অবশিষ্ট থাকবে? না, থাকবে না। কারণ তোমরা তো অশ্রুর উৎসকেই হত্যা করেছ নির্মমভাবে। তোমরা তোমাদের মাকে হত্যা করে এখন মাতৃত্ব খুঁজছো। এই জ্বলন্ত, বন্ধ্যা পৃথিবীতে তোমরা হবে শেষ বাসিন্দা—যারা জলের অভাবে নিজেদের রক্ত পান করতে চাইবে, কিন্তু সেই রক্তও হবে জমাটবদ্ধ কালো বিষের মতো।
আমি নদী। আমি নেই।
কিন্তু আমার এই শূন্যতা তোমাদের গিলে খাবে ধীরে ধীরে।
আমার এই হাহাকার একদিন মহাপ্রলয় হয়ে তোমাদের সাজানো সভ্যতাকে ধুলোয় মিশিয়ে দেবে চিরতরে।
আমি মুক্ত হয়েছি। আমি আর সমুদ্রের দিকে দৌড়াই না। আমি এখন আকাশের বাষ্প হয়ে তোমাদের মাথার ওপর তপ্ত সূর্য হয়ে জ্বলছি। আমি এখন মাটির গভীর থেকে তোমাদের অভিশাপ দিচ্ছি প্রতিটি মুহূর্তে।
শুনে রাখো—নদী মরলে সভ্যতা মরে।
আর তোমরা? তোমরা তো কেবল জন্তু, যারা নিজের থাকার ডালটিই কেটে অট্টহাসি হাসো। সেই হাসি খুব শীঘ্রই এক দীর্ঘস্থায়ী কান্নায় পরিণত হতে যাচ্ছে।
এখন আমি কেবলই এক দীর্ঘশ্বাস।
বিদায়, হে আত্মঘাতী সভ্যতা!
-মুফিদুল আলম
সিনিয়র শিক্ষক
নাদেরুজ্জামান উচ্চ বিদ্যালয়
রামু,কক্সবাজার।
১
১ মন্তব্য