প্রধান শিক্ষক
০৫ এপ্রিল, ২০২৬ ০৫:০৭ অপরাহ্ণ
বর্তমান ২০২৬ এপ্রিল মাসের প্রেক্ষাপটে প্রাথমিক শিক্ষায় মর্নিং শিফট ও কর্মঘন্টা কমিয়ে পাঠদান কার্যক্রম কতটা যৌক্তিক!
বর্তমান প্রেক্ষাপটে, বিশেষ করে বিদ্যালয়জট, শিক্ষকের সংকট ও শিশুদের মনোযোগের সীমাবদ্ধতা বিবেচনায় মর্নিং শিফট (সকালের শিফট) এবং কর্মঘণ্টা কমিয়ে প্রাথমিক শিক্ষা চালু করার কার্যকারিতা বিশ্লেষণ করা যাক।
মর্নিং শিফট বলতে এখানে কী বোঝানো হচ্ছে?
সাধারণত দুই ধরনের মডেল হতে পারে:
১. শুধুমাত্র সকালের শিফট (সকাল ৮টা – দুপুর ১২টা) এবং বিদ্যালয় বন্ধ। বিকালে কোনো শিফট নেই।
২. দুটি শিফট: একটি সকালের (যেমন ৭-১১টা), অপরটি দুপুরের (১২-৪টা)। এখানে শিক্ষক ও শিক্ষার্থী উভয়ের কর্মঘণ্টা কমে যাবে (প্রতিটি শিফট ৪ ঘণ্টা)।
আপনার পরামর্শের মূল উপাদান: কাজের সময় কমানো (সম্ভবত ৩-৪ ঘণ্টা) এবং সকালের শিফটে সীমাবদ্ধ রাখা।
কার্যকারিতার সম্ভাব্য দিক (পজিটিভ)
বিষয় বিশ্লেষণ
শিশুর মনোযোগ ও স্বাস্থ্য প্রাথমিক স্তরের শিশুদের ধারাবাহিক মনোযোগ ধারণ ক্ষমতা কম (সাধারণত ২০-৩০ মিনিট)। ৩-৪ ঘণ্টার কাঠামোবদ্ধ ক্লাস তাদের জন্য মানসিক চাপ কমায়। এছাড়া খুব সকালে ক্লাস শুরু করলে গরমের প্রকোপ এড়ানো যায় (বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে জুন-অক্টোবর পর্যন্ত তীব্র গরম)।
অভিভাবকের সুবিধা কর্মজীবী অভিভাবকরা সকালে সন্তানকে স্কুল দিয়ে তারপর অফিসে যেতে পারেন। বিকালে বাড়ি ফিরে সহায়তা করার সময় পান।
শিক্ষকের কার্যকারিতা কম সময়ে ক্লাস নিলে শিক্ষকের ক্লান্তি কমে, পাঠদানের মান বাড়ে। বাড়তি সময় তিনি প্রশ্নপত্র তৈরি, মূল্যায়ন বা প্রশিক্ষণে ব্যয় করতে পারেন।
অবকাঠামোগত সুবিধা একটি বিদ্যালয়ে দুই শিফট চালু থাকলে একই কক্ষ, আসবাব ও উপকরণ ব্যবহার করে দ্বিগুণ শিক্ষার্থী পড়াতে পারে। এটি শিক্ষার্থী ঘনত্ব কমাতেও সাহায্য করে (সামাজিক দূরত্ব বজায় রাখা সহজ)।
শিখন ঘাটতি পূরণ করোনা-পরবর্তী প্রাথমিক শিক্ষার্থীদের মধ্যে বড় ধরনের শিখন ঘাটতি আছে। অল্প সময়ে ঘনীভূত, মজাদার ও কার্যকরী পাঠ (গেম-ভিত্তিক, গল্প, অনুশীলন) দিনে ৩ ঘণ্টা চালালে ফল ভালো হতে পারে।
সীমাবদ্ধতা ও চ্যালেঞ্জ (নেতিবাচক)
বিষয় বিশ্লেষণ
পাঠ্যসূচি সম্পন্ন করা বর্তমান প্রাথমিক পাঠ্যসূচি দৈনিক ৫-৬ ঘণ্টার জন্য তৈরি। সেটি ৩-৪ ঘণ্টায় নামিয়ে আনলে গুরুত্বপূর্ণ অংশ বাদ যেতে পারে, অথবা বাড়ির কাজের চাপ বাড়বে।
দুপুরের শিফটের সমস্যা যদি শুধু সকালের শিফট রাখা হয়, তাহলে অতিরিক্ত শিক্ষার্থী কীভাবে পড়বে? (বিদ্যালয়ের সংখ্যা বাড়াতে হবে)। আর যদি দুপুরের শিফটও রাখা হয়, তবে সেই শিফটে শিশুরা দুপুরে গরমে ও ক্লান্তিতে ভোগে, আর অভিভাবকের পক্ষে দুপুরে স্কুলে পাঠানো কষ্টকর।
সামাজিক ও শারীরিক বিকাশ প্রাথমিক শিক্ষার অন্যতম লক্ষ্য হল দলবদ্ধ কাজ, খেলাধুলা, মুক্তমঞ্চে সৃজনশীলতা। সময় কমে গেলে এসব কার্যক্রম কাটছাট করা হতে পারে, যা শিশুর পূর্ণ বিকাশে বাধা দেয়।
পরিবহন ও নিরাপত্তা সকাল ৭টায় স্কুল শুরু মানে অনেক শিশুকে ভোর ৬টায় ঘর থেকে বেরোতে হয়, যা গ্রামাঞ্চলে নিরাপদ নয় (অন্ধকার থাকে)। আবার স্কুল ছুটির পর (১১টা) অভিভাবক যদি কর্মস্থলে থাকেন, তাহলে বিকাল পর্যন্ত সন্তানের তত্ত্বাবধান হয় না।
শিক্ষকের অতিরিক্ত শিফট যদি একজন শিক্ষককে সকাল ও দুপুর—দুটি শিফটেই পড়াতে হয় (অনেক দেশে বাধ্যতামূলক), তাহলে তার কর্মঘণ্টা বেড়ে যায়, যা অকার্যকর। বরং আলাদা শিক্ষক নিয়োগ ব্যয়বহুল।
বর্তমান বাংলাদেশ প্রেক্ষাপটে মূল্যায়ন
· গ্রামীণ এলাকা (প্রাথমিক বিদ্যালয়ের সিংহভাগ): সেখানে ইতিমধ্যে একক শিফট চলে (সকাল ১০টা থেকে বিকাল ৪টা)। এখানে মর্নিং শিফট চালু করলে স্কুলের সময় বদলানো ছাড়া বিশেষ লাভ নেই, বরং অভিভাবকদের খেতের কাজ, গৃহস্থালির সঙ্গে সংঘাত হবে। কর্মঘণ্টা কমানো মানে চাকরির সময়সীমা কমিয়ে দেওয়া, যা প্রাথমিক শিক্ষকদের বেতন ও পদমর্যাদার সাথে যায় না।
· শহরাঞ্চলে (ওভারক্রাউডেড স্কুল): দুই শিফট কার্যকর হতে পারে। তবে সেক্ষেত্রে প্রতিটি শিফটের সময় ৪ ঘণ্টা রাখলে (যেমন সকাল ৭-১১, দুপুর ১২-৪) পাঠদান শেষ করা যেতে পারে। তবে শিক্ষার্থীদের জন্য দিনে মাত্র ৪ ঘণ্টা স্কুল যথেষ্ট কিনা, তা নিয়ে গবেষণা নেই।
উপসংহার: কতটা কার্যকর?
সীমিত পরিসরে কার্যকর, কিন্তু সার্বিকভাবে চ্যালেঞ্জিং।
· সবচেয়ে কার্যকর হবে যদি:
· শুধুমাত্র ওভারক্রাউডেড শহুরে বিদ্যালয়ে দুই শিফট চালু করা হয় (প্রতি শিফট ৪ ঘণ্টা)।
· পাঠ্যসূচি কমিয়ে অত্যন্ত দক্ষ ও মজাদার শিক্ষাদানের মাধ্যমে মূল দক্ষতা (পড়া, লেখা, অঙ্ক) নিশ্চিত করা হয়।
· অভিভাবকদের বিকালের তত্ত্বাবধানের জন্য স্কুলভিত্তিক খেলার আয়োজন বা কমিউনিটি সেন্টার থাকে।
· যেখানে কার্যকর নয়:
· গ্রামীণ এলাকায়, যেখানে বিদ্যালয় কম দূরত্বে এবং শিশুদের হেঁটে আসা-যাওয়ার সময় বেশি প্রয়োজন।
· যেখানে শিক্ষকসংখ্যা অপ্রতুল (এক শিফটেই পড়ানো কঠিন)।
· যেখানে শিশুরা পুষ্টিহীনতা ও ঘুমের অভাবে ভোগে (সকালের শিফটে উপস্থিতি কম হবে)।
সর্বোত্তম প্রস্তাব: বর্তমান একক শিফট বজায় রেখে শিক্ষার সময় কমিয়ে (যেমন সপ্তাহে ৫ দিন, দৈনিক ৪ ঘণ্টা) মানসম্মত শিক্ষার ওপর জোর দেওয়া, এবং বাকি সময় খেলাধুলা, সঙ্গীত, চিত্রাঙ্কনের মতো আনুষ্ঠানিক শিক্ষার জন্য ব্যবহার করা। এতে কর্মঘণ্টা কমে, কিন্তু শিক্ষার ব্যাপ্তি বাড়ে। মর্নিং শিফট শুধু অতিরিক্ত শিক্ষার্থীর চাপ সামাল দিতে দ্বিতীয় শিফট হিসেবে যুক্তিযুক্ত, এককভাবে নয়।
১
১ মন্তব্য