Loading..

ব্লগ

রিসেট

০৪ এপ্রিল, ২০২৬ ০৯:৩৬ অপরাহ্ণ

হাম সম্পর্কে অজানা সব তথ্য

হাম বা রুবিওলা (ইংরেজি: Rubeola) একটি অত্যন্ত ছোয়াঁচে ও তীব্র ভাইরাসঘটিত রোগ। প্যারামক্সিভাইরাস গোত্রের মর্বিলিভাইরাস গণের অন্তর্গত একটি ভাইরাসের কারণে রোগটি ঘটে থাকে; ভাইরাসটির পূর্ণ বৈজ্ঞানিক নাম মিজল্‌স মর্বিলিভাইরাস (Measles morbillivirus)।[৩][১০][১১] ভাইরাসটি প্রথমে শ্বাসনালিতে সংক্রমিত হয়, এরপর রক্তের মাধ্যমে দেহের অন্যান্য অংশে ছড়িয়ে পড়ে। বাগদাদ-ভিত্তিক পারসিক চিকিৎসক আবু বকর মুহাম্মদ ইবন জাকারিয়া আল রাজি সর্বপ্রথম খ্রিস্টীয় ৯ম শতকে হাম রোগটির বিস্তারিত লিখিত বর্ণনা দেন। ১৭৫৭ সালে ফ্রান্সিস হোম নামক একজন স্কটীয় চিকিৎসক রোগীর রক্তে উপস্থিত একটি সংক্রামক জীবাণুর কারণে যে হাম রোগটি হয়, তা প্রমাণ করেন। ১৯৫৪ সালে মার্কিন চিকিৎসক জন এন্ডার্স ও টমাস পিবলস মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের ম্যাসাচুসেটস অঙ্গরাজ্যের বস্টন নগরীতে হামে আক্রান্ত রোগীদের রক্তের নমুনা সংগ্রহ করে সেখান থেকে হামের ভাইরাসটিকে পৃথক করতে সক্ষম হন। হামের ভাইরাসটি একটি একসূত্রবিশিষ্ট, ঋণাত্মক-দিকমুখী, আবরণীবিশিষ্ট, অখণ্ডিত আরএনএ ভাইরাস। ভাইরাসটির ২৪টি প্রকারণ থাকা সম্পর্কে নির্ভরযোগ্য প্রমাণ পাওয়া গেছে, তবে বর্তমানে মাত্র ৬টি প্রকারণ মানবজাতিতে ঘুরে বেড়াচ্ছে। মানুষ ভাইরাসটির স্বাভাবিক পোষক; মানুষ ছাড়া অন্য কোনও প্রাণীর হাম হয় না।[আক্রান্ত হয় বলে এক বছর থেকে ১৮ মাস বয়সী শিশুদের হামের টিকার প্রথম মাত্রাটি দেওয়া হয়। এরপর ৪ থেকে ৬ বছর বয়সে দ্বিতীয় মাত্রা বা ডোজটি দিতে হয়। এক বছরের কম বয়সের শিশুদের টিকা দেওয়া হয় না; তারা ইতিমধ্যেই হাম রোগ হওয়া ও অনাক্রম্যতা অর্জনকারী মায়ের গর্ভে থাকার সময় পরোক্ষভাবে বা জন্মের পরে মায়ের বুকের দুধ পান করে অনাক্রম্যতা (প্রতিরক্ষিকা বা অ্যান্টিবডি) অর্জন করে, তবে বুকের দুধ খাওয়া বন্ধ করলে আড়াই মাসেই অনাক্রম্যতা চলে যায়। তবে যেসব মায়ের জীবনে কখনও হাম হয়নি, কিন্তু হামের টিকা গ্রহণ করা আছে, তারা তাদের ভ্রূণে প্রতিরক্ষিকা প্রদান করে না, ফলে ঐসব শিশু জন্ম থেকেই হামের বিরুদ্ধে আক্রান্তপ্রবণ হতে পারে। ১৯৫৬ সালের পরে জন্ম নেওয়া সমস্ত প্রাপ্তবয়স্ক ব্যক্তি যাদের কোনও দিন হাম হয়নি বা শৈশবে টিকা নেয়নি, তাদেরও অন্তত একটি মাত্রায় হামের টিকা নেওয়া আবশ্যক। তবে গর্ভবতী নারী, এইডস, যক্ষ্মা বা কর্কটরোগে (ক্যান্সার) আক্রান্ত ব্যক্তি, অণুচক্রিকা-স্বল্পতায় ভোগা ব্যক্তি, সম্প্রতি রক্ত বা রক্তরস (প্লাজমা) দান করা ব্যক্তি, অনাক্রম্যতন্ত্রের উপর প্রভাব পড়ে এমন ঔষধ গ্রহণকারী ব্যক্তি, সম্প্রতি অন্য কোনও টিকা গ্রহণকারী ব্যক্তি কিংবা হামের টিকার কোনও উপাদানের প্রতি জীবনঘাতী অতিপ্রতিক্রিয়া (অ্যালার্জি) প্রদর্শনকারী ব্যক্তিদের জন্য হামের টিকা নেওয়া নিষেধ। বর্তমানে শিশুদেরকে সাধারণত হামের টিকা আলাদা করে দেওয়া হয় না, বরং এমএমআর টিকা (হাম, গালফোলা রোগ বা মাম্পস ও জার্মান হাম বা রুবেলার টিকা) কিংবা এমএমআরভি টিকার (হাম, মাম্পস, রুবেলা ও জলবসন্ত বা ভ্যারিসেলার টিকা) অংশ হিসেবে প্রদান করা হয়।[৭][১৪]


উন্নত দেশগুলির মধ্যে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে ১৯৮৫ থেকে ১৯৯২ সাল পর্যন্ত হামের রোগীদের মাত্র ০.২%-এর মৃত্যু ঘটে,[৫] কিন্তু অপুষ্টিতে ভোগা ব্যক্তিদের ক্ষেত্রে মৃত্যুহার ১০% পর্যন্ত উঠতে পারে।[৭] বেশিরভাগ হামজনিত মৃত্যুই অনূর্ধ্ব ৫ বছর বয়সী শিশুদের মধ্যে ঘটে থাকে।[১২] ইদানিং ভ্রমণের কারণে ও টিকা নিতে অনীহার কারণে বিভিন্ন দেশে হামের বিরুদ্ধে অনাক্রম্যতা হ্রাস পাচ্ছে ও হামের ঝুঁকিতে থাকা ব্যক্তির সংখ্যা বৃদ্ধি পাচ্ছে।[১৫][১৬][১৭] এছাড়া হামের টিকাটি গরম আবহাওয়ায় কার্যকারিতা হারায়, তাই বিদ্যুৎচালিত হিমায়কের উপরে নির্ভরশীল শীতল সরবরাহ শৃঙ্খলে কোনও ব্যাঘাত ঘটলে এটিকে সমস্ত শিশুর কাছে পৌঁছে দেওয়া সম্ভব হয় না। দারিদ্র্য বা যুদ্ধবিগ্রহের কারণে হিমায়ক ও বিদ্যুৎ সরবরাহের অভাবে ভোগা দেশ বা অঞ্চলে এই সমস্যাটি প্রকট। তাই আরও কার্যকরী ও তাপসহ টিকা উদ্ভাবনের প্রচেষ্টা অব্যাহত আছে। এখনও বহু উন্নয়নশীল দেশে হাম বিরাজ করছে। বিশেষ করে আফ্রিকা ও এশিয়া মহাদেশের কিছু অঞ্চলে এর প্রাদুর্ভাব বেশি। হামজনিত মৃত্যুর ৯৫%-ই নিম্ন মাথাপিছু আয় ও দুর্বল স্বাস্থ্য অবকাঠামোবিশিষ্ট দেশগুলিতে ঘটে থাকে। যেসমস্ত দেশ প্রাকৃতিক দুর্যোগ বা যুদ্ধবিগ্রহের শিকার, সেগুলিতে হামের প্রাদুর্ভাব মারাত্মক আকার ধারণ করতে পারে। স্বাস্থ্য অবকাঠামো ও স্বাস্থ্যসেবার ক্ষতির ফলে নিয়মিত টিকাদান কর্মসূচি ব্যাহত হতে পারে এবং আবাসিক ত্রাণ বা উদ্বাস্তু শিবিরগুলিতে ভিড়ের কারণে সংক্রমণের ঝুঁকি বহুগুণ বেড়ে যেতে পারে।


হামের সংক্রমণ রোধ করা খুবই জরুরি। হামের বিরুদ্ধে সম্প্রদায়ব্যাপী বা যূথ অনাক্রম্যতা (Herd immunity হার্ড ইমিউনিটি) অর্জন করতে হলে সময়মত কমপক্ষে কোনও জনসমষ্টির ৯৫-৯৬% ব্যক্তির দুই মাত্রায় (ডোজ) টিকা দেওয়া থাকতে হবে। ২০১০-এর দশকে এসে বিশ্ব পর্যায়ে হামের টিকার প্রথম মাত্রাটি গড়ে প্রায় ৮৫% শিশুকে দেয়া সম্ভব হয়েছে, এবং দ্বিতীয় মাত্রাটির সংখ্যা বাড়লেও ২০১০-এর দশকের শেষে এসে মাত্র ৭১% শিশুকে দ্বিতীয় মাত্রার টিকাদানের আওতায় আনা সম্ভব হয়েছে। ফলে এখনও বিশ্বে হামের কারণে বহু শিশু টিকার অভাবে মারা যাচ্ছে। ২০১৯ সালে টিকার আবশ্যকীয় ব্যাপ্তির অনুপস্থিতির কারণে সব মিলিয়ে ২ লক্ষেরও বেশি ব্যক্তি হামের কারণে মারা যায়, যাদের সিংহভাগই ছিল শিশু। ২০১০-এর দশকে এসে গণতান্ত্রিক কঙ্গো প্রজাতন্ত্র, মাদাগাস্কার, মধ্য আফ্রিকান প্রজাতন্ত্র, জর্জিয়া, কাজাখস্তান, উত্তর ম্যাসিডোনিয়া, সামোয়া, টোঙ্গা ও ইউক্রেনে হামের ব্যাপক প্রাদুর্ভাব ঘটে।[৯]

মন্তব্য করুন

ব্লগ