সহকারী শিক্ষক
০১ এপ্রিল, ২০২৬ ১০:৪৬ অপরাহ্ণ
সহকারী শিক্ষক
জ্বালানি সাশ্রয়ের লক্ষ্যে অনলাইন ক্লাস: বাস্তবতা, সীমাবদ্ধতা ও করণীয়
বর্তমান বিশ্বে জ্বালানি সাশ্রয় একটি গুরুত্বপূর্ণ জাতীয় অগ্রাধিকার হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে। এই লক্ষ্য অর্জনে বিভিন্ন খাতে বিকল্প ব্যবস্থা গ্রহণ করা হচ্ছে, যার মধ্যে শিক্ষাক্ষেত্রে আংশিক অনলাইন ক্লাস চালুর উদ্যোগও অন্যতম। প্রস্তাব অনুযায়ী, বিদ্যালয়ে সপ্তাহে তিন দিন অনলাইন ক্লাস পরিচালনার মাধ্যমে জ্বালানি ব্যয় কমানো যেতে পারে। তবে প্রশ্ন হচ্ছে—বাংলাদেশের গ্রামাঞ্চলের বাস্তবতায় এই সিদ্ধান্ত কতটুকু যৌক্তিক এবং কার্যকর?
প্রথমত, প্রযুক্তিগত অবকাঠামোর সীমাবদ্ধতা এই উদ্যোগের প্রধান প্রতিবন্ধকতা। গ্রামীণ অঞ্চলের অধিকাংশ পরিবারে এখনো স্মার্টফোন বা নিরবচ্ছিন্ন ইন্টারনেট সংযোগ নেই। অনেক ক্ষেত্রে একটি পরিবারের একাধিক শিক্ষার্থী থাকলেও তাদের জন্য একটি মাত্র ডিভাইস থাকে, যা দিয়ে নিয়মিত অনলাইন ক্লাস করা প্রায় অসম্ভব। ফলে একটি বড় অংশের শিক্ষার্থী অনলাইন শিক্ষার বাইরে থেকে যাবে, যা শিক্ষায় বৈষম্য বাড়াবে এবং শেখার ঘাটতি (learning gap) সৃষ্টি করবে।
দ্বিতীয়ত, অভিভাবকদের প্রযুক্তিগত দক্ষতা ও সচেতনতার অভাবও একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। শহরের তুলনায় গ্রামাঞ্চলের অভিভাবকদের অনেকেই ডিজিটাল ডিভাইস ব্যবহারে পারদর্শী নন। ফলে তারা সন্তানের অনলাইন ক্লাসে অংশগ্রহণ নিশ্চিত করতে পারেন না বা প্রয়োজনীয় তদারকি করতে ব্যর্থ হন। এতে শিক্ষার্থীদের অনলাইন শিক্ষার প্রতি আগ্রহ ও শৃঙ্খলা বজায় রাখা কঠিন হয়ে পড়ে।
তৃতীয়ত, করোনা মহামারীর সময় অনলাইন শিক্ষার যে অভিজ্ঞতা হয়েছে, তা এই উদ্যোগের সীমাবদ্ধতাকে আরও স্পষ্ট করে। সেই সময়ে দেখা গেছে, অনেক শিক্ষার্থী নিয়মিত ক্লাসে অংশগ্রহণ করেনি এবং যারা অংশগ্রহণ করেছে তাদের মধ্যেও শেখার মান প্রত্যাশিত পর্যায়ে পৌঁছায়নি। অনলাইন ক্লাসের সুযোগে অনেক শিক্ষার্থী মোবাইল ফোনে গেম, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম বা অন্যান্য বিনোদনমূলক কার্যক্রমে বেশি সময় ব্যয় করেছে।
এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে মোবাইল আসক্তির ঝুঁকি। শিশুদের হাতে দীর্ঘ সময় মোবাইল ফোন থাকার ফলে তারা সহজেই আসক্ত হয়ে পড়ে, যা তাদের মানসিক ও শারীরিক স্বাস্থ্যের ওপর নেতিবাচক প্রভাব ফেলে। একবার এই আসক্তি তৈরি হলে তা থেকে বের হয়ে আসা অত্যন্ত কঠিন হয়ে যায়, যা ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য একটি বড় উদ্বেগের বিষয়।
অন্যদিকে, অনলাইন ক্লাস চালুর মাধ্যমে কিছুটা জ্বালানি সাশ্রয় সম্ভব হলেও এর বাস্তব প্রভাব সীমিত। যাতায়াত কমার ফলে কিছু জ্বালানি সাশ্রয় হলেও বাড়তি বিদ্যুৎ ও ইন্টারনেট ব্যবহারের কারণে সেই সাশ্রয়ের পরিমাণ অনেকাংশে কমে যেতে পারে। ফলে এই উদ্যোগের সামগ্রিক লাভ-ক্ষতির ভারসাম্য বিবেচনা করা জরুরি।
শিক্ষার মানের দিক থেকেও অনলাইন পদ্ধতি সব স্তরের শিক্ষার্থীর জন্য সমান কার্যকর নয়। বিশেষ করে প্রাথমিক ও মাধ্যমিক স্তরের শিক্ষার্থীদের জন্য সরাসরি শ্রেণিকক্ষে শিক্ষক-শিক্ষার্থীর মিথস্ক্রিয়া অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। অনলাইন ক্লাসে এই মিথস্ক্রিয়া সীমিত হয়ে যায়, ফলে শেখার গুণগত মান কমে যেতে পারে।
এই প্রেক্ষাপটে বিকল্প কিছু উদ্যোগ গ্রহণ করা যেতে পারে। যেমন—বিদ্যালয়ের সময়সূচি পুনর্বিন্যাস, জ্বালানি সাশ্রয়ী অবকাঠামো (যেমন সৌরবিদ্যুৎ) ব্যবহার,
সবশেষে বলা যায়, জ্বালানি সাশ্রয়ের উদ্দেশ্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ হলেও তা বাস্তবায়নের ক্ষেত্রে দেশের সামগ্রিক সামাজিক ও প্রযুক্তিগত বাস্তবতা বিবেচনা করা অপরিহার্য। বিশেষ করে গ্রামাঞ্চলের শিক্ষার্থীদের কথা মাথায় রেখে পরিকল্পনা গ্রহণ না করলে এই উদ্যোগ উল্টো শিক্ষার মান ও সমতা—দুইয়ের ওপরই নেতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে। তাই একটি সুসমন্বিত, বাস্তবভিত্তিক এবং অন্তর্ভুক্তিমূলক নীতিমালা গ্রহণই হতে পারে সময়োপযোগী ও টেকসই সমাধান।
১
১ মন্তব্য