Loading..

ব্লগ

রিসেট

৩১ মার্চ, ২০২৬ ০৩:১২ অপরাহ্ণ

রাজশাহী শহরের পদ্মা: যৌবনের ক্লান্তি ও পুনর্জন্মের প্রতিশ্রুতি

রাজশাহী শহরের পদ্মা: যৌবনের ক্লান্তি ও পুনর্জন্মের প্রতিশ্রুতি

শৈশবের পাতায়, বইয়ের অক্ষরে আমি প্রথম দেখেছিলাম প্রমত্তা পদ্মাকে। সে ছিল দুরন্ত যুবতী—জোয়ারে ফুলে উঠত তার বুক, ঢেউয়ে ঢেউয়ে ছড়িয়ে দিত জীবনের বীজ, চর গড়ে তুলত নতুন স্বপ্নের ভিত। গ্রামের শিশুরা তার তীরে খেলত, জেলেরা নৌকায় গান গাইত, কৃষকেরা তার উর্বর চরে ফসলের সোনালি হাসি ফুটাত। পদ্মা তখন ছিল রূপ, রস ও রাগের সমন্বয়—এক অবাধ, বন্যা-স্বরূপ নদী, যার গর্জনে মানুষের হৃদয় কেঁপে উঠত আনন্দে।

কিন্তু রাজশাহী শহরের পাড়ে দাঁড়িয়ে, বাস্তবের চোখে যখন তাকে দেখলাম, তখন সেই বইয়ের যৌবন যেন ম্লান হয়ে গেছে। নদী বয়ে চলছে ধীরে, প্রায় নিঃশব্দে। তার বুকে জমেছে মরা চরের ধুলো, ঢেউ শিথিল, গর্জন ক্ষীণ। শহরের ধোঁয়া-ধুলো, প্লাস্টিকের বর্জ্য, গৃহস্থালির নোংরা জল—সব মিলিয়ে পদ্মা আজ ক্লান্ত এক বৃদ্ধা। তার যৌবনের দাপট নেই, কেবল অভিজ্ঞতার ভার। মনে হয়, সে যেন বলছে—“আমি এখনও বই, কিন্তু তোমাদের হাতে আমার শক্তি ক্ষয় হয়েছে।”

এই ক্লান্তির পেছনে শুধু সময়ের ছাপ নয়, মানুষের করুণ অবহেলা। অবৈজ্ঞানিক বালি উত্তোলন নদীর বুক খুঁড়ে ফেলছে, তীরভূমি ভাঙন প্রতি বছর গিলে খাচ্ছে শত শত বিঘা জমি, অনিয়ন্ত্রিত শিল্পের বর্জ্য আর শহরের স্লুইস গেট দিয়ে প্রবাহিত নোংরা জল তার শিরায় শিরায় বিষ ছড়াচ্ছে। রাজশাহীর পদ্মা আজ দূষণের শিকার—শুধু শক্তি হারায়নি, জীববৈচিত্র্যও হারাচ্ছে। জেলেরা আর মাছ পান না যেমন আগে, কৃষকেরা চরে ফসল ফলাতে পারেন না ধুলো-মাটির কারণে। চরগুলো, যেখানে একদিন শিশুরা দৌড়াদৌড়ি করত, আজ অনেকটা মরুভূমির মতো—মৃত, শুকনো, নিস্তব্ধ।

তবু পদ্মা মরে না। নদী কখনো পুরোপুরি মরে না। সে শুধু রূপ বদলায়। তার যৌবন এখন লুকিয়ে আছে স্মৃতির গভীরে—সেই প্রমত্ত জোয়ারের গান, চর সৃষ্টির সৃজনশীলতা, জীবনের অবিরাম প্রবাহ। রাজশাহীর পদ্মা আজ শুয়ে থাকা এক অভিজ্ঞ নারীর মতো, চোখে ঝলমল করে অতীতের উজ্জ্বলতা, কিন্তু শরীরে বয়ে চলে ক্লান্তির ভার। তার ধীর স্রোতে মিশে আছে মানবসৃষ্ট বিপর্যয়ের ছাপ: জলবায়ু পরিবর্তনের অস্থিরতা, উজানের বাঁধের প্রভাব, অতিরিক্ত সেচ আর দূষণ।

পদ্মার চরগুলো আজ সাক্ষী। একসময় সেখানে জীবনের উৎসব ছিল—ফসলের সবুজ, মাছের রুপালি ঝিলিক, মানুষের হাসি। আজ অনেক চর মরা, ভাঙা তীরে ক্ষতের দাগ। প্রতি বছর বর্ষায় ভাঙন তীব্র হয়, হাজারো পরিবার ঘরছাড়া হয়, চরবাসীরা আশ্রয় খোঁজে শহরের বাঁধে। এই ভাঙন শুধু জমি খায় না, খায় সংস্কৃতি, খায় ইতিহাস, খায় আগামী প্রজন্মের স্বপ্ন। জলবায়ু পরিবর্তন এই প্রক্রিয়াকে আরও ভয়ংকর করে তুলছে—অনিয়মিত বৃষ্টি, তীব্র খরা, অস্বাভাবিক জলপ্রবাহ। আগামী দিনে যদি এই অবহেলা চলতে থাকে, তাহলে রাজশাহীর সন্তানেরা শুধু এই ক্লান্ত পদ্মাকেই দেখবে, প্রমত্ত যৌবনকে নয়।

কিন্তু আশা এখনও আছে। পদ্মা যেমন কখনো পুরোপুরি মরে না, তেমনি তার পুনর্জন্মও সম্ভব। নদীর প্রাকৃতিক প্রবাহ ফিরিয়ে আনা, বাঁধ ও সেচ ব্যবস্থাকে বৈজ্ঞানিকভাবে পরিকল্পনা করা, বালি উত্তোলন কঠোরভাবে নিয়ন্ত্রণ করা, তীরভূমি ও চর সংরক্ষণের জন্য বৃক্ষরোপণ ও ইকো-ইঞ্জিনিয়ারিং—এসবই পদ্মার যৌবন ফিরিয়ে আনতে পারে। শহরের বর্জ্য ব্যবস্থাপনা উন্নত করলে, দূষণ কমলে, নদী আবার চর গড়বে, জীবন ছড়াবে, মাছ-ফসল ফিরবে।

রাজশাহী শহরের পদ্মা শুধু একটি নদী নয়। এটি আমাদের ইতিহাসের ধমনী, সংস্কৃতির আয়না, পরিবেশের প্রতীক এবং ভবিষ্যতের সতর্কবার্তা। নদীকে বাঁচানো মানে শুধু জল বাঁচানো নয়—বাঁচানো খাদ্য, জীবিকা, স্বাস্থ্য, সংস্কৃতি এবং আমাদের সন্তানদের স্বপ্ন। যদি আমরা অবহেলা করি, তাহলে হারাব শুধু পদ্মাকে নয়, হারাব নিজেদের জীবনের ভিত্তি। আর যদি রক্ষা করি, তাহলে পদ্মা আবার প্রমত্ত জোয়ারে ফিরে আসবে—যৌবন ফিরবে, রূপ ফিরবে, রস ফিরবে।

পদ্মার এই ক্লান্ত ধারায় লুকিয়ে আছে এক গভীর শিক্ষা: সৌন্দর্য শুধু জোয়ারে নয়, নীরবতায়ও থাকে। তার ধীরগতি আমাদের বলে—প্রকৃতির সঙ্গে যুদ্ধ করো না, তার সঙ্গে মিলে চলো। রাজশাহীর পদ্মা আজ সময়ের সঙ্গে বয়ে চলেছে, মানবসৃষ্ট ক্ষতের ভার বহন করে, কিন্তু ভবিষ্যতের প্রতিশ্রুতি নিয়ে। আমাদের হাতে তার পুনর্জন্মের দায়িত্ব।

নদী রক্ষা করো। পরিবেশ সচেতনতা জাগাও। প্রতিটি নাগরিক, প্রতিটি যুবক, প্রতিটি নীতিনির্ধারক—এসো, হাত মেলাই। পদ্মাকে বাঁচালে আমরা নিজেদেরই বাঁচাই। যৌবন ফিরে আসবে। জীবন ফিরে আসবে। পৃথিবী ফিরে আসবে তার স্বাভাবিক রূপে।

পদ্মা শিখিয়েছে—পরিবেশ সচেতনতা আমাদের সময়ের প্রয়োজন, আর আমাদের দায়িত্ব চিরন্তন। নদীকে রক্ষা করলেই আমরা নিজেদের রক্ষা করব।

রাজশাহী : ৩০-৩-২০২৬

- মুফিদুল আলম
শিক্ষক, পরিবেশ চিন্তক
রামু,কক্সবাজার

মন্তব্য করুন

ব্লগ