সিনিয়র শিক্ষক
২৯ মার্চ, ২০২৬ ০৫:৫২ পূর্বাহ্ণ
ঘুম, মন ও মস্তিষ্ক এর কিভাবে আরামের খোরাক
মস্তিষ্কের ‘রিসেট’ বাটন: ৪৫ মিনিটের দুপুরের ঘুম ও সিন্যাপটিক রিসেট তত্ত্ব
দুপুরের আহারের পর শরীরজুড়ে এক ধরনের অলসতা নেমে আসা আমাদের অতি পরিচিত অভিজ্ঞতা। কর্মব্যস্ত জীবনে একে অনেক সময় 'আলসেমি' হিসেবে গণ্য করা হলেও আধুনিক স্নায়ুবিজ্ঞান বা নিউরোসায়েন্স বলছে ভিন্ন কথা। গবেষণায় দেখা গেছে, দুপুরের এই তন্দ্রাচ্ছন্ন ভাব আসলে মস্তিষ্কের একটি জৈবিক সংকেত, যা ইঙ্গিত দেয় যে সিস্টেমের ‘মেমোরি’ পূর্ণ হয়ে গেছে এবং এখন একটি 'রিসেট' প্রয়োজন।
সিন্যাপটিক ওভারলোড: যখন মস্তিষ্কের মেমোরি ফুল হয়
আমাদের মস্তিষ্কের কোটি কোটি স্নায়ুকোষ বা নিউরন একে অপরের সাথে সংযোগ স্থাপন করে, যাকে বিজ্ঞানের ভাষায় সিন্যাপস (Synapse) বলা হয়। সারাদিন আমরা যখন নতুন তথ্য গ্রহণ করি, শিখি বা কাজ করি, তখন এই সিন্যাপসগুলো শক্তিশালী ও ঘন হতে থাকে। কিন্তু এই প্রক্রিয়ার একটি সীমাবদ্ধতা আছে। সুইজারল্যান্ডের ইউনিভার্সিটি অব জেনেভা এবং জার্মানির ইউনিভার্সিটি অব ফ্রাইবুর্গের গবেষকদের মতে, সারাদিন জাগ্রত অবস্থায় ক্রমাগত তথ্য প্রসেস করতে করতে সিন্যাপটিক সংযোগগুলো এতটাই বেড়ে যায় যে মস্তিষ্ক নতুন তথ্য নেওয়ার ক্ষমতা হারিয়ে ফেলে। ঠিক যেন একটি স্মার্টফোনের স্টোরেজ পূর্ণ হয়ে গেলে সেটি ধীরগতির হয়ে যায়।
সিন্যাপটিক রিসেট: ৪৫ মিনিটের জাদুকরী প্রভাব
সম্প্রতি নিউরোইমেজ জার্নালে প্রকাশিত গবেষণায় গবেষক দল প্রধান অধ্যাপক ক্রিস্টফ নিসেন উল্লেখ করেছেন যে, দুপুরে মাত্র ৪৫ মিনিটের একটি ঘুম মস্তিষ্কের এই অতিরিক্ত সিন্যাপটিক চাপ কমিয়ে দেয়। একে বলা হয় সিন্যাপটিক রিসেট (Synaptic Reset)।
এই প্রক্রিয়ার বিশেষত্ব হলো:
তথ্য বিন্যাস: এটি পুরোনো বা গুরুত্বপূর্ণ স্মৃতি মুছে ফেলে না, বরং অগোছালো তথ্যগুলোকে গুছিয়ে নতুন তথ্যের জন্য জায়গা তৈরি করে।
নমনীয়তা বৃদ্ধি: ঘুম থেকে ওঠার পর মস্তিষ্ক আবার নমনীয় (Plasticity) হয়ে ওঠে, ফলে নতুন কিছু শেখার গতি বৃদ্ধি পায়।
মনোযোগ পুনর্গঠন: ইইজি (EEG) এবং ট্রান্সক্র্যানিয়াল ম্যাগনেটিক স্টিমুলেশনের মাধ্যমে দেখা গেছে, যারা ৪৫ মিনিট ঘুমিয়েছেন, তাদের মনোযোগ ও কাজের দক্ষতা যারা জেগে ছিলেন তাদের তুলনায় বহুগুণ বেশি।
পাওয়ার ন্যাপের উপকারিতা ও কর্মক্ষেত্রে প্রভাব
যেকোনো সৃজনশীল বা বুদ্ধিবৃত্তিক পেশার মানুষের জন্য এই স্বল্পকালীন ঘুম বা 'পাওয়ার ন্যাপ' টনিকের মতো কাজ করে।
শিক্ষার্থী: দীর্ঘক্ষণ পড়ার মাঝে বিরতি নিয়ে অল্প ঘুম পড়া মনে রাখতে সাহায্য করে।
পেশাজীবী: দুপুরের পর কাজের যে স্থবিরতা আসে, তা কাটিয়ে পূর্ণ উদ্যমে কাজে ফিরতে সাহায্য করে।
সতর্কতা: নিরাপত্তা কর্মী বা চালকদের ক্ষেত্রে এটি তাৎক্ষণিক সিদ্ধান্ত নেওয়ার ক্ষমতা বাড়ায়।
একটি সতর্কবার্তা: প্রাকৃতিক বনাম কৃত্রিম ঘুম
গবেষকরা অনিদ্রা বা ইনসোমনিয়ার ক্ষেত্রে হুটহাট ঘুমের ওষুধ খাওয়ার ব্যাপারে কঠোর সতর্কতা অবলম্বন করেছেন। অধ্যাপক কাই স্পিগেলহালডার জানান, ঘুমের ওষুধ মস্তিষ্কের এই প্রাকৃতিক ‘রিসেট’ প্রক্রিয়াকে বাধাগ্রস্ত করতে পারে। সুস্থ মস্তিষ্কের জন্য প্রাকৃতিক ঘুমই একমাত্র সমাধান।
উপসংহার
দুপুরের ঘুম মানেই সময় নষ্ট নয়, বরং এটি আগামী কয়েক ঘণ্টার জন্য মস্তিষ্ককে রিচার্জ করার একটি বৈজ্ঞানিক পদ্ধতি। শরীর যখন বিশ্রাম চায়, তখন তাকে জোর করে সচল রাখার চেষ্টা আদতে কর্মদক্ষতা কমিয়ে দেয়। তাই কাজের মাঝে নিজেকে সতেজ রাখতে এবং মস্তিষ্কের কার্যকারিতা অক্ষুণ্ণ রাখতে ৪৫ মিনিটের একটি ছোট্ট ঘুম হতে পারে আপনার সেরা বিনিয়োগ।
এক, স্যারের সংগ্রহশালা থেকে
৫
৫ মন্তব্য