Loading..

ব্লগ

রিসেট

২৭ মার্চ, ২০২৬ ০৮:৪৯ অপরাহ্ণ

পুরনো সময়ে আকিকা, খৎনা কিংবা বিবাহের অনুষ্ঠানে কলাপাতায় ভাত খাওয়াটা একটি ঐতিহ্যবাহী লোকজ সংস্কৃতি ছিলো :


✒️ পুরনো সময়ে আকিকা, খৎনা কিংবা বিবাহের অনুষ্ঠানে কলাপাতায় ভাত খাওয়াটা একটি ঐতিহ্যবাহী লোকজ সংস্কৃতি ছিলো :

=======================



নব্বইয়ের দশকে কিংবা তারোও আগে বিবাহ, আকিকা বা খৎনার অনুষ্ঠানে শালপাতা, কলাপাতা বা পদ্ম ফুলের গোলাকার  পাতা থালা হিসেবে ব্যবহৃত হতো  আর গ্লাস হিসেবে  মাটির গ্লাস ব্যবহার করা হতো।আজকালকার মতো টেবিল, চেয়ারে বসে খাওয়ার রেওয়াজ ছিলো না। সেই সময়ে মাটিতে কাপড় বা সামিয়ানা বিছিয়ে দাওয়াতে খাবার পরিবেশন করা হতো। এই রেওয়াজ  সকল শ্রেণির মানুষের মধ্যে প্রচলিত ছিল, হোক সে গরীব কিংবা ধনাঢ্য পরিবার। একসাথে কয়েকশো অতিথি খেয়ে উঠলে সাথে সাথে খাবেরের তৈজসপত্রগুলি ( কলাপাতার থালা, মাটির গ্লাস) তুলে ফেলে দেওয়া হতো। পরে আবার নতুন ব্যাচের জন্য নতুন করে সেই থালা এবং মাটির গ্লাস দেয়া হতো প্রত্যেকের জন্যে। এভাবেই সেই সকল অনুষ্ঠানগুলি সুসম্পাদিত হতো। তবে কোনো ক্ষেত্রে কেবলমাত্র কাঁচের গ্লাস ব্যবহার করা হতো। এখনও অনেক গ্রামীণ এলাকার  বিভিন্ন  অনুষ্ঠানে অত্যন্ত এই জনপ্রিয় ও ঐতিহ্যবাহী লোকজ সংস্কৃতি মেনে চলা হয়।



এই ঐতিহ্যবাহী লোকজ সাংস্কৃতিক দিকগুলোর পেছনে কিছু কারণও  ছিলো। যেমন - 


১. পরিবেশবান্ধব: কলাপাতা সম্পূর্ণ প্রাকৃতিক এবং পচনশীল। এটি ব্যবহারের পর কোনো অপচনশীল বর্জ্য তৈরি হয় না, যা বর্তমান পরিবেশ সচেতনতার যুগেও প্রাসঙ্গিক।


২. বিশুদ্ধতা: হিন্দু ও বাঙালি লোকজ সংস্কৃতিতে কলাপাতাকে অত্যন্ত পবিত্র ও শুদ্ধ মনে করা হয়। ভোজের জন্য এটি অত্যন্ত স্বাস্থ্যকর।


৩. ঐতিহ্যবাহী স্বাদ: কলাপাতা বিশেষ করে পদ্ম পাতায় গরম ভাত ও তরকারি পরিবেশন করলে তাতে একটি বিশেষ সুন্দর গন্ধ ও স্বাদ যোগ হয়।


৪. সম্প্রদায়ের বন্ধন: গ্রামের বড় বড় বিয়েতে কলাপাতা কেটে, ধুয়ে প্রস্তুত করা থেকে শুরু করে একসাথে বসে খাওয়ার মধ্যে সামাজিক বন্ধন ও উৎসবের আমেজ ফুটে উঠত।


সময়ের সাথে সাথে প্লেট বা ওয়ানটাইম পাত্রের ব্যবহার বাড়লেও, লোকজ সংস্কৃতি হিসেবে কলাপাতায় ভোজের কদর এখনও অনেক জায়গায় অটুট রয়েছে।




নব্বই দশকে বিয়েবাড়ি বা যেকোন অনুষ্ঠানে ছিল:

====================


১) শালপাতা, কলাপাতা বা পদ্ম ফুলের গোলাকার  পাতার থালা, মাটির গ্লাস।


২ ) সেই ভোর বেলায় গরু, ছাগল জবাই করে সকাল হতে না হতেই গোস্ত কাটা হয়ে যেতো। 

বাড়ির বাইরে খোলায় রান্না করত রান্নার লোক বা রাধুনি। রান্না শেষে গোস্ত রাখা হতো বড় সিলভারের সাসপেন্ডে। গোস্তের রান্নার হাড়িতে মুড়ি মেখে সকলে খেতো ধুম করে।


৩) রান্না হয়ে গেলে খাবারগুলো বড় বড় সিলভারের সাসপেন্ডে করে একটি ঘরে রেখে সেই ঘরের দরজা তালাবদ্ধ করে রাখা হতো। সেখানে একজন সদস্য সার্বক্ষণিক চাবি নিয়ে থাকতো। যখন যা কিছু লাগতো তিনি তালা খুলে পরিবেশন করার জন্য সেই খাবার দিয়ে দিতেন ।


৪)  নিজেদের বাড়ির উঠানে বা বাড়ির বাইরের খোলায় নিজেরাই  কাপড় দিয়ে ঘিরে প্যান্ডেল তৈরি করে খাওয়ানোর পর্ব চলতো।


৫) খাবার পরিবেশনের দায়িত্বে থাকতো  বাড়ির এবং পাড়ার আত্মীয় স্বজন, ছেলে- যুবক এবং পুরুষেরা।


৬) একেকজনের কাছে একেকটা খাবার পরিবেশন করার দায়িত্ব থাকতো। কেউ ভাত বা পোলাও পরিবেশন করতো। কেউ পরিবেশন করতো মাংস। এরকম একেকজন একেকটা খাবার পরিবেশন করতো।  একটা খাবার নিয়ে প্রতিটি সারিতে ঘোরা হত অনেকবার।


৭) খাবার পরিবেশনের জন্য অ্যালুমিনিয়ামের বালতি, ধামা থেকে ভাত তোলার জন্য প্লেট, রসগোল্লা বা মিষ্টি  তোলার জন্য হাত।


৮) পানি , নুন, লেবু, সালাত, চাটনি ইত্যাদি পরিবেশনের দায়িত্ব থাকতো  খুঁদে সদস্যদের কাছে।


৯) ভাত, ডাল, মাছ, মাংস, মিষ্টি, দই পরিবেশনের দায়িত্ব পরিবারের অভিজ্ঞ সদস্যদের।


১০)থাকত লেজওয়ালা আস্ত একটা মাছ ভাজা ।


১১) গোস্তের বালতি নিয়ে চেঁচিয়ে চেঁচিয়ে হাঁক দিত গোস্ত লাগবে, গোস্ত। 


১২) কেউ গোস্ত দিয়ে রান্না করা বুটের ডালের বালতি নিয়ে চেঁচিয়ে চেঁচিয়ে বলতো ডাল নিবেন, ডাল।


১৩)  ক্ষুদে সদস্যরা পানির সিলভারের জোগ নিয়ে ঘুরে ঘুরে দেখে বেড়াতো কার গ্লাসে পানি নেই।পানি না থাকলে গ্লাস ভরে পানি দিয়ে যেতো। 


১৪ ) খাওয়ার শেষে থাকতো দই,  রসগোল্লা। খাওয়া শেষ হলে হাত দিয়ে মিষ্টি বা বড় হাঁড়ি থেকে একটি চামুচ দিয়ে দই কেটে কেটে পাতে দেওয়ার রীতি ছিলো ।


১৫ ) বাড়ির মুরুব্বী অতিথিদের কাছে খোঁজ খবর নিতেন।জিজ্ঞেস করতেন রান্না কেমন হয়েছে? কোনো সমস্যা আছে কিনা? "কোনো কিছু নিতে লজ্জা করবেন না। নিজের বাড়ি মনেকরে পেটভরে খাবেন ।" - এভাবেই অতিথিদের নিকট নিজের সৌজন্যতা প্রকাশ করতেন। 


১৬) পেন্ডেলের গেটে একজন পান আর টুথপিক নিয়ে বসে থাকতো। অতিথিরা খাওয়ার শেষে গেট দিয়ে যাওয়ার সময়  হাতে ধরিয়ে দিত চকচকে কাগজে মোড়া মিষ্টি পান যাতে থাকতো  একটি করে টুথপিক গোঁজা।


যদি কোনো সামান্য অব্যবস্থাপনা হতো তাহলে দাওয়াতে যতই ভালো খাবার পরিবেশন করা হোক না কেন সেই পরিবারের প্রতি নিন্দার ঝড় বয়ে যেতো। তাই শৃঙ্খলার প্রতি সকলের মনোযোগ ছিলো অত্যান্ত নিবিড়। 💐



https://www.facebook.com/share/r/1BV4oU15QC/


মন্তব্য করুন

ব্লগ