সিনিয়র শিক্ষক
২৪ মার্চ, ২০২৬ ০৪:৪৭ অপরাহ্ণ
সার্টিফিকেটের ফাঁদে আটকে যাওয়া যুবশক্তি: দক্ষতা-ভিত্তিক শিক্ষাই একমাত্র মুক্তির পথ
সার্টিফিকেটের ফাঁদে আটকে যাওয়া যুবশক্তি: দক্ষতা-ভিত্তিক শিক্ষাই একমাত্র মুক্তির পথ
সম্প্রতি বিএনপি মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর ঠাকুরগাঁওয়ে এক অনুষ্ঠানে স্পষ্ট করে বলেছেন—বেকারত্ব দূর করতে বিএ-এমএ ডিগ্রির ওপর জোর কমিয়ে ভোকেশনাল, টেকনিক্যাল ও স্কিল-ভিত্তিক শিক্ষা বাড়াতে হবে। তিনি উদাহরণ দিয়ে বলেছেন, “যদি তুমি ইলেকট্রিশিয়ানের ট্রেনিং নিতে, তাহলে আজ চাকরি পেতে।”
এক বছর আগে আমি একটি আর্টিকেলে লিখেছিলাম: “সার্টিফিকেট ধারী বেকার নয়, সার্টিফিকেটবিহীন দক্ষ কর্মী চাই।” আজ ফখরুল সাহেবের কথায় সেই একই সত্য আবার জোরালো হয়ে উঠেছে। এটা কোনো রাজনৈতিক বক্তব্য নয়—এটা বাংলাদেশের যুবসমাজের বেঁচে থাকার প্রশ্ন।
বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর (BBS) লেবার ফোর্স সার্ভে ২০২৪ অনুসারে, দেশে মোট বেকারের সংখ্যা ২৬.২৪ লাখ। এর মধ্যে বিশ্ববিদ্যালয় গ্র্যাজুয়েটই ৮.৮৫ লাখ! গ্র্যাজুয়েটদের বেকারত্বের হার ১৩.৫%—জাতীয় গড়ের তিনগুণেরও বেশি। যুবকদের (১৫-২৯ বছর) বেকারত্ব ৮-১১.৫%। অথচ যাদের কোনো ডিগ্রি নেই, তাদের অনেকেই অনানুষ্ঠানিক খাতে কাজ করে খেয়ে-পরে বেঁচে আছে। এই পরিসংখ্যান একটা কঠিন সত্য চিৎকার করে বলছে—আমরা ডিগ্রি তৈরি করছি, দক্ষ কর্মী তৈরি করছি না।
সমস্যাটা কোথায়?
শিক্ষা ব্যবস্থা পুরোপুরি সার্টিফিকেট-কেন্দ্রিক। এমপিওভুক্ত কলেজগুলোতে লাখ লাখ ছেলেমেয়ে বিএ, এমএ, এমএসসি পাস করে বেরোচ্ছে, কিন্তু তাদের হাতে কোনো প্র্যাকটিক্যাল স্কিল নেই। নিয়োগকর্তারা বলেন, “ডিগ্রিধারী পাওয়া যায়, কিন্তু কাজের লোক পাওয়া যায় না।” একজন গ্র্যাজুয়েটকে চাকরিতে যোগ দিয়ে প্রথম ৬-১২ মাস শুধু ট্রেনিং দিতে হয়। অথচ একজন ইলেকট্রিশিয়ান বা কম্পিউটার টেকনিশিয়ান ৬ মাসের ট্রেড কোর্স করে সঙ্গে সঙ্গে রোজগার শুরু করতে পারে।
এই অবস্থা শুধু বেকারত্ব তৈরি করছে না, দেশের অর্থনীতিকেও ক্ষতিগ্রস্ত করছে। প্রতি বছর প্রায় ২০ লাখ যুবক শ্রমবাজারে ঢুকছে। কিন্তু তাদের অধিকাংশই দক্ষতা ছাড়া। ফলে শিল্প-কারখানায় দক্ষ টেকনিশিয়ানের অভাব, বিদেশে রেমিট্যান্সের সুযোগ হারানো, এবং সবচেয়ে বড় কথা—যুবশক্তির হতাশা। এই হতাশা থেকেই সমাজে অস্থিরতা, মাদক, অপরাধ বাড়ছে।
বিশ্বের সফল দেশগুলো কী করেছে?
জার্মানির ডুয়াল ভোকেশনাল সিস্টেম (Dual Education System) বিশ্বের সেরা উদাহরণ। সেখানে ছাত্ররা ক্লাসরুমে পড়ে আর কারখানায় কাজ করে একসঙ্গে। ফলে জার্মানির যুব বেকারত্বের হার মাত্র ৫-৬%। সিঙ্গাপুর ও দক্ষিণ কোরিয়া একই পথে গিয়ে বিশ্বের শীর্ষ অর্থনীতিতে উঠে এসেছে। তারা ডিগ্রিকে গুরুত্ব দেয়, কিন্তু দক্ষতাকে বাধ্যতামূলক করে।
আমরা কেন পারব না?
সমাধান কী?
১. স্কুল-কলেজ লেভেল থেকে ভোকেশনাল কোর্স চালু করা।
২. ডিগ্রির সঙ্গে স্কিল সার্টিফিকেট বাধ্যতামূলক করা (ইন্টার্নশিপ, ট্রেড কোর্স)।
৩. শিল্পের চাহিদা অনুযায়ী কারিকুলাম তৈরি (ইন্ডাস্ট্রি-অ্যাকাডেমিয়া লিংকেজ)।
৪. এমপিওভুক্ত কলেজগুলোতে শুধু বিএ-এমএ নয়, টেকনিক্যাল ও ভোকেশনাল কোর্স বাড়ানো।
৫. সরকারি-বেসরকারি উদ্যোগে বিনামূল্যে/স্বল্পমূল্যে ট্রেনিং সেন্টার গড়ে তোলা।
ফখরুল সাহেবের কথায় “বিএ-এমএ বন্ধ করুন” বলা হয়নি—বলা হয়েছে জোর কমান। আমরাও তাই বলি। যারা গবেষণা, শিক্ষকতা, প্রশাসন চায়, তাদের জন্য ডিগ্রি থাকুক। কিন্তু যাদের দরকার শুধু রোজগার, তাদের জন্য দক্ষতা।
আজ সময় এসেছে চোখ খোলার।
যুবকদের আর বলব না “পড়ো, ডিগ্রি নাও, চাকরি পাবে”।
বলব—“দক্ষ হও, তাহলে চাকরি তোমাকে খুঁজবে।”
সার্টিফিকেট ধারী বেকারের যুগ শেষ করতে হবে।
সার্টিফিকেটবিহীন দক্ষ কর্মীর যুগ শুরু করতে হবে।
এটাই আমাদের যুবশক্তির একমাত্র মুক্তি।
এটাই বাংলাদেশের ভবিষ্যতের একমাত্র ভিত্তি।
-মুফিদুল আলম
শিক্ষক
রামু,কক্সবাজার।
১
১ মন্তব্য