Loading..

ব্লগ

রিসেট

২৪ মার্চ, ২০২৬ ০৬:৩২ পূর্বাহ্ণ

একবিংশ শতকের শিক্ষার্থীর প্রযুক্তি নিয়ে ভাবনা ও অভিভাবকের উদ্বিগতা

একবিংশ শতকের শিক্ষার্থীর প্রযুক্তি নিয়ে ভাবনা ও অভিভাবকের উদ্বিগ্নতা

সভ্যতার বিবর্তনের সাথে মানবজাতির চাহিদা ও রুচি প্রতিনিয়ত পরিবর্তন হচ্ছে। একবিংশ শতকের প্রযুক্তির উৎকর্ষতার জোয়ারে এর সবচেয়ে বেশী প্রভাব পড়েছে তরু শিক্ষার্থীদের শিক্ষা জীবনে। প্রযুক্তি নির্ভর শিখন-শেখানো কৌশলের নতুন নতুন আইডিয়া বদলে দিচ্ছে ট্র্যাডিশনাল পদ্ধতিকে। এতে শিক্ষার্থীদের ভাবনা ও মনোজগতেও এসেছে দৃশ্যমান পরিবর্তন। ফলে শিক্ষার্থীরা আজ শিক্ষকের চোখে অমনোযোগী, আত্নীয়-স্বজনের কাছে অসামাজিক আর প্রতিবেশীর মতে আত্নকেন্দ্রিক। অন্যদিকে পিতা-মাতাও যথেষ্ট উদ্বিগ্ন সন্তানদের পড়ার টেবিল কিংবা পরিবারের চেয়ে ডিভাইসের সাথে বেশী সময় দেয়ার জন্য। প্রযুক্তির দৈত্য যেন তাদের গিলে ফেলেছে। একই বাসায় বসবাস করেও পরিবারের সকলে একসাথে সময় কাটানো কিংবা  টেলিভিশনের সামনে বসে একত্রে নাটক বা মুভি দেখা যেন স্মৃতি মাত্র।  অনেক অভিভাবক একে ডিজিটাল ইলনেস আখ্যা দিয়ে ডিভাইস কেড়ে নেয়ার মাধ্যমে সমস্যার সমাধান খুঁজেন। সময়ের সাথে এগিয়ে যাবার এই প্রযুক্তিকে উপেক্ষা করে “দ্বার বন্ধ করে দিয়ে ভ্রমটাকে রুখি” নীতিতে বর্তমান যুগে গুণগত শিক্ষা নিশ্চিত করা কি আদৌ সম্ভব? তাহলে করণীয় কী? যে প্রজন্ম প্রযুক্তির সংস্পর্শে বড় হয়েছে। প্রাথমিক থেকে উচ্চশিক্ষায় প্রবেশকালে প্রযুক্তিকে অক্সিজেনের মতো অত্যাবশ্যকীয় উপাদান বানিয়েছে। জোর করে তাদের আগের প্রজন্মের দিকে ঠেলে দেয়া উচিৎ হবে নাকি সময়ের সাথে তাদের বদলে দেয়ার সুযোগ দিতে হবে ও আমাদের নিজেদেরকেও বদলে ফেলতে হবে। এ সিদ্ধান্তে আসার পূর্বে একবিংশ শতাব্দীর শিক্ষার্থীদের মনস্তাত্ত্বিক ভাবনা, প্রত্যাশা এবং বৈশ্বিক বাস্তবতা নিয়ে চুলচেরা বিশ্লেষণ দরকার

আমাদের ধ্যান ধারণায় যদি লালন করি যে এ যুগের শিক্ষার্থীরা মধ্যযুগের শিষ্যের মতো প্রশ্নহীন আনুগত্য বজায় রেখে গুরুর প্রতিটি কথা বেদবাক্যের মতো মেনে চলবে। তাহলে বুঝতে হবে তাদের ভাবনা জগতে আমরা নেই। কেননা বর্তমানে শেখার জন্য ক্লাশরুম ছাড়াও অনেক প্লাটফর্ম রয়েছে যা শিক্ষার্থীদের প্রত্যাশিত চাহিদা পূরণে সক্ষম। ইউটিউবে আছে হাজারো টিউটোরিয়াল যেখানে শ্রেণি শিক্ষকের লেকচার শুনার পুর্বেই শিক্ষার্থী সমৃদ্ধ ভার্চূয়াল  লেকচার শুনে নিজেকে এগিয়ে নিতে পারে। অনেক শিক্ষার্থী এই দুয়ের মাঝে তুলনামূলক ও গুনগত পার্থক্য খুঁজে সেরাটির দিকেই ঝুঁকে পড়ে। তাহলে সনাতন পদ্ধতিতে লেকচার শুনতে শিক্ষার্থীরা কেন ক্লাশরুমে আসবে। পাশাপাশি ব্লেন্ডেড লার্ণিং পদ্ধতি ক্লাশের একঘেয়েমি মনোভাব দূর করে শিক্ষার্থীদের প্রাণবন্ত ও উজ্জীবিত রাখার এক নতুন প্রয়াস। অনলাইন ও অফলাইন এ দুয়ের সমন্বয়ে এটি একটি হাইব্রিড টিচিং পদ্ধতি যেখানে ঘরে বসে শিক্ষার্থীরা ডিভাইসের সহায়তায় পরীক্ষা দেয়া, এসাইনমেন্ট জমাকরণ, হোমওয়ার্ক প্রদান এবং শিক্ষকের নিখুঁত মূল্যায়ন সবই সম্ভব। মাইক্রোসফট টিম, জুম, গুগল মিট, কিংবা স্কাইপের সহায়তায় শিক্ষার্থীরা পৃথিবীর যে কোন প্রান্ত থেকে ভার্চুয়াল ক্লাশে অংশ নিতে পারে। অন্যদিকে ইন্টেরেকটিভ স্মার্টবোর্ড সমৃদ্ধ ক্লাশরুমে শিক্ষার্থী ঘরে বসে বাস্তবের মতো ক্লাশে উপস্থিত হয়ে শ্রেণি কার্যক্রমেও অংশগ্রহণ করতে পারে। এ আই দ্বারা পরিচালিত চ্যাট জিপিটি বর্তমানে শিক্ষার্থীদের কাছে খুবই জনপ্রিয় একটি সফটওয়্যার যা যে কোন প্রশ্নের উত্তর দ্রুত ও নির্ভুল ভাবে দিতে পারে। শিক্ষার্থীদের রচনা, প্রবন্ধ, গল্প, উপন্যাস, কবিতা, এসাইনমেন্ট কিংবা গবেষণা প্রভৃতি তৈরি করতে এটি জাদুকরি সহায়তা করে থাকে। ভার্চুয়াল পার্টনার হিসেবে এটির ব্যবহার দিন দিন বাড়ছে। সোশ্যাল মিডিয়ায় বিভিন্ন গ্রুপ তৈরি করে পাঠ্য বিষয়ক বিভিন্ন তথ্য ও রিসোর্স শেয়ার করতে বর্তমানে শিক্ষার্থীরা অনেক বেশী স্বাচ্ছন্দবোধ করে থাকে। এটি একটি আলোচনা ও আনন্দের সাথে  অংশগ্রহণমূলক শিক্ষা পদ্ধতি হিসেবে বিবেচিত। লার্ণিং ম্যানেজমেন্ট সিস্টেম (এল এম এস)  ই-লার্ণিং এর একটি বৃহত্তর ও সর্বাধূনিক প্লাটফর্ম। ক্লাউড সিস্টেমে শ্রেণি কার্যক্রমের সকল রিসোর্স শিক্ষার্থী এখানে পেতে পারে। বিভিন্ন শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে এর ব্যবহার ক্রমেই জনপ্রিয় হচ্ছে। কোর্সেরা কিংবা খান একাডেমীর মতো অনেক ভার্চুয়াল প্লাটফর্ম শিক্ষার্থীদের বিভিন্ন বিষয়ের অনলাইন টিউটোরিয়াল কোর্স অফার করছে। টেন মিনিট স্কুল বর্তমানে দেশের সবচেয়ে বড় অনলাইনভিত্তিক টিচার প্যানেল যেখানে শিক্ষার্থীরা ঘরে বসে অভিজ্ঞ টিচারদের তত্ত্বাবধানে লাইভ ক্লাশে অংশ নিতে পারে। ইতিমধ্যে টেন মিনিট স্কুল শিক্ষার্থীদের মাঝে প্রচুর আগ্রহ তৈরি করেছে।  ই-বুক, ডিজিটাল নোট, ক্লাউড স্টোরেজ, জ্যামবোর্ড, অনলাইন হোয়াইট বোর্ড প্রভৃতি ব্যবহারের মাধ্যমে শিক্ষার্থীরা প্রয়োজনীয় রিসোর্স পারস্পারিক শেয়ার করে নিজেদের সমৃদ্ধ করতে পারে। কাহুট, কুইজলেট প্রভৃতি মোবাইল এপস জনপ্রিয় ভার্চূয়াল লার্ণিং গেমস যা শিক্ষার্থীদের দক্ষতা বৃদ্ধি সহায়ক।  সম্প্রতি গুগুলে সংযুক্ত হয়েছে শিক্ষামূলক অনেক ফিচার যা শিক্ষার্থীদের জটিল সমস্যা মূহুর্তেই সমাধান করে দেয়। এ ছাড়া গুগল ডকস, গুগল স্লাইড, গুগল শীট ও গুগল ফর্ম প্রভৃতির ব্যবহার শিখন-শেখানো কার্যক্রমে উত্তরোত্তর বৃদ্ধি পাচ্ছে।  পৃথিবীর যে কোন ভাষাকে অন্য ভাষায় অনুবাদ বর্তমানে শুধুমাত্র ডিভাইসের একটি ক্লিক মাত্র। এ আই এর ভার্চুয়াল ল্যাঙ্গুয়েজ পার্টনার কিংবা বিভিন্ন এপস এর সহায়তায় শিক্ষার্থীরা  যে কোন বিদেশী ভাষা সহজেই শিখতে পারে। ফ্রি ল্যান্সিং ও আউটসোর্সিং শব্দদ্বয় বর্তমান প্রজন্মের শিক্ষার্থীদের কাছে খুবই জনপ্রিয়।  বিভিন্ন মার্কেট প্লেসে অনলাইনভত্তিক বিভিন্ন কাজ করে শিক্ষার্থীরা লেখাপড়ার পাশাপাশি বাড়তি আয়ের মাধ্যমে নিজেদের স্বাবলম্বী এবং পরিবারকেও সহায়তা করে থাকে।

এভাবে শিক্ষার্থীরা বেশিরভাগ সময় অনলাইনের সাথে সংযুক্ত থাকাটা সময়ের চাহিদা ও বাস্তবতা।  আমাদের মনে রাখতে হবে যে এই প্রজন্মের শিক্ষার্থীদের বেড়ে উঠার পরিবেশ যেমন আগের প্রজন্মের চেয়ে ভিন্ন তেমনি তাদের জীবনের ভিশন, মিশন, রুচি, আবেগ, আচরণ প্রভৃতিও  বৈচিত্র্যময় এবং ভিন্ন।  প্রযুক্তির উন্নতির সাথে তারা নিজেদের স্বপ্ন, ভাবনা ও মানসিকতাকে  খাপ খাইয়ে নিয়েছে।  তাই অনলাইনভিত্তিক প্লাটফর্মগুলোকে  পাঠ্যবই, শ্রেণি শিক্ষক কিংবা বিদ্যালইয়ের বিকল্প ভাবতে শুরু করেছে। এছাড়া এটি তাদের বিনোদন ও আনন্দের উৎস হিসেবেও বিবেচিত।  এ জন্য এ যুগের সন্তানদের প্রথম চাহিদা ল্যাপটপ কিংবা স্মার্টফোন। তাই বলে কি সন্তানগণ  এভাবে মনুষত্যবিহীন রোবটে পরিণত হবে? নিঃসঙ্গতার যাতাকলে পিষ্ট হয়ে বিভিন্ন মানসিক অস্থিরতায় ভূগবে? এ সব চিন্তায় অভিভাবকদের কপালে মোটা ভাঁজ পড়ে যাচ্ছে। সৈয়দ মুজতবা আলীর “কুইনাইন জ্বর সারাবে, কুইনাইন সারাবে কে?” উক্তির প্রয়োগ আজ তাদের সম্মুখে। অভিভাবকগণ তাদের পেশাগত দায়িত্ব নিয়ে খুব ব্যস্ত থাকার কারণে সন্তানদের পর্যাপ্ত সময় দিতে পারছেনা। সন্তানদের সাথে বন্ধুর মতো মিশতে হবে। তাদের সাথে ভালো-মন্দ সবকিছু শেয়ার করতে হবে। তাদের মান, অভিমান, আবেগ, ভালোবাসা প্রভৃতিকে মূল্যায়ন করে সঠিক সিদ্ধান্ত নিতে হবে। বাহিরে বেড়ানো ও খেলাধূলায় উৎসাহিত করতে হবে। বিভিন্ন সৃজনশীল কাজে তাদের ব্যস্ত রাখতে হবে। ধর্মীয় ও নৈতিক শিক্ষার প্রতি আগ্রহী করতে হবে। পারিবারিক সময়ে ডিভাইস ব্যবহার নিষিদ্ধ ও প্রয়োজনে তা ব্যবহারের সময়সীমা নির্ধারণ করে দিতে হবে। তারা যে সকল সাইটগুলিতে প্রবেশ করে তার উপর নজর রাখতে হবে এবং প্রয়োজনে প্যারেন্টাল রেস্ট্রিকশন আরোপ করতে হবে। এ জন্য অভিভাবকদেরও প্রযুক্তি ব্যবহারে পারদর্শীতা অর্জন করা প্রয়োজন। অন্যদিকে অনেক শিক্ষক আধূনিক টিচিং-লার্ণিং মেথড সম্পর্কে ধারণা না থাকার কারণে মানসম্মত কন্টেন্ট তৈরি করে শিক্ষার্থীদের শ্রেণিকক্ষমূখী করতে পারছেনা। আবার অনেকের প্রযুক্তির ব্যবহার কিংবা মাল্টিমিডিয়া ক্লাশরুমের প্রতি রয়েছে বিতৃষ্ণা। প্রযুক্তিকে উপেক্ষা করে যেহেতু সময়ের সাথে এগিয়ে যাবার সুযোগ নেই তাই শিক্ষকদেরও এগিয়ে আসতে হবে যুগোপযোগী ও মানসম্পন্ন  কন্টেন্ট তৈরি করে অনলাইন ও অফলাইনে তা শেয়ার করা। আবার অনেক শিক্ষকের নতুন কারিকুলাম বাস্তবায়ন সম্পর্কে সীমিত অভিজ্ঞতার কারনে শিক্ষার্থীরা অনেকাংশে ভার্চূয়াল ক্লাশের প্রতি ঝুঁকে পড়েছে।

পরিশেষে বলা যায় যে উন্নত বিশ্বের শিক্ষা ব্যবস্থাপনার সাথে তাল মিলিয়ে সরকারকেও শিক্ষকদের আধূনিক শিক্ষণ কৌশল সম্পর্কে প্রশিক্ষণ দিতে হবে। সকল প্রতিষ্ঠানে মাল্টিমিডিয়ার ব্যবহার নিশ্চিত করতে হবে। শিক্ষকদের আর্থিক স্বচ্লতা ও সামাজীক মর্যাদা নিশ্চিত করতে হবে প্রয়োজনে বিশেষ প্রণোদনা মাধ্যমে তাদের মোটিভেশন করতে হবে। একবিংশ শতকের শিক্ষার্থীরা যেন একইসঙ্গে প্রযুক্তিতে দক্ষ এবং মানবিক গুণাবলিসম্পন্ন হয়, সেটা নিশ্চিত করার দায়িত্ব আমাদের। শিক্ষার্থীদের অন্তর্নিহিত সম্ভাবনা বিকাশের মাধ্যমে একটা সুন্দর ও ডিজিটাল সমাজ যেন আমরা গড়তে পারি এ বিষয়ে এখনি আমাদের সচেতন হতে হবে।    

 

মুহাম্মদ আবদুল কাদির

সহকারী পরিচালক

উচ্চমাধ্যমিক শিক্ষক প্রশিক্ষণ ইনস্টিটিউট, কুমিল্লা

মোবাইল-০১৮১৯১১৫০৪৭

[email protected]

মন্তব্য করুন

ব্লগ