প্রভাষক
২২ মার্চ, ২০২৬ ১১:০১ অপরাহ্ণ
এক ভয়ংকর অশুভ কালরাত
আমাদের জাতীয় জীবনে উপস্থিত এক ভয়ংকর অশুভ কালরাত।স্বাধীনতার ঘোষণার প্রাক্কালে পশ্চিম পাকিস্তানি কর্তৃক কাপুরুষোচিত এ বর্বর হামলায় সহস্র মানুষ প্রাণ হারায় যা বাংলাদেশের ইতিহাসে গণহত্যা নামে অভিহিত।
গণহত্যা কী?
গণহত্যা (Genocide) হলো কোনো বৃহত্তম গোষ্ঠী বা বৃহৎ শাসকগোষ্ঠী কর্তৃক কোনো দেশের ওপর বা জাতি,দল-মত-বর্ণ বা ধর্মীয় মূল্যবোধকে নির্মূলের উদ্দেশ্যে আকস্মিক বা পরিকল্পিত ভাবে অতর্কিত হত্যাযজ্ঞ চালানো এবং তাতে অগণিত মানুষের প্রাণ হারানোর ঘটনাকেই গণহত্যা বলে।জাতিসংঘের ১৯৪৮ সালের 'জেনোসাইড কনভেনশন ' অনুযায়ী গণহত্যা একটি আন্তর্জাতিক অপরাধ। এক্ষেত্রে বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধ, দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের হলোকাস্ট বা রুয়ান্ডার গণহত্যার কথা বলা যেতে পারে এমন কি আজকের দিনের ইরাক-যুক্তরাষ্ট্র,রাশিয়া-ইউক্রেন,ইজরায়েল-ফিলিস্তিনের গাজা উপত্যকা কিংবা ইরান,ইসরায়েল ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যকার যুদ্ধেও অগণিত মানুষ প্রাণ হারাচ্ছে;আমরা এই যুদ্ধের প্রাণহানিকেও গণহত্যা বলতে পারি।
বর্তমান চলমান যুদ্ধে ব্যাপক মারণাস্ত্র ব্যবহারের ফলে অগণিত মানুষ প্রাণ হারাচ্ছে যা গণহত্যার সামিল।
গণহত্যা' শব্দটি প্রথম পোলিশ আইনজীবী রাফায়েল লেমকিন ১৯৪৪ সালে তার "Axis Rule in occupied Europe" বইতে ব্যবহার করেন। এটি গ্রীক উপসর্গ 'জেনাস' যার অর্থ জাতি বা উপজাতি এবং ল্যাটিন প্রত্যয় 'সিড' যার অর্থ হত্যা।এই বইতে তিনি নাৎসি অধিকৃত ইউরোপে অক্ষশক্তির আইনি ও প্রশাসনিক শোষণ চিত্র তুলে ধরেন। এই বইতে তিনি সাংস্কৃতিক ধ্বংস, অর্থনৈতিক শোষণ, জোরপূর্বক শ্রম এবং জাতিগত নিধনের মাধ্যমে একটি জাতির পরিচয় মুছে ফেলার ভয়াবহ বিবরণ দেন।
গণহত্যা কখন থেকে শুরু হয়?
আসলে ইতিহাসে গণহত্যার সুনির্দিষ্ট কোনো সময়সীমার উল্লেখ নেই। বলা যায় যেদিন থেকে পৃথিবীতে মানববসতি শুরু হয় তখন থেকেই মানবমন্ডলীর মধ্যে হিংসা -প্রতিহিংসা,পারস্পরিক সংঘাতের সৃষ্টি হয়।এই পারস্পরিক সংঘাত ও হিংসা -প্রতিহিংসা এক সময় বৃহৎ আকার ধারণ করে হত্যাকান্ডের মতো ভয়াবহ রূপ লাভ করে।তারপরও ঐতিহাসিকদের মতে ১৪৬ খ্রিষ্টপূর্বে তৃতীয় পিউনিক যুদ্ধের সময় রোমানদের দ্বারা কার্তেজ ধ্বংস এবং সেখানকার অধিবাসীদের হত্যাকে অনেকেই প্রথম নথিবদ্ধ গণহত্যা বলে মনে করেন।বাংলাদেশে ১৯৭১ সালের ২৫শে মার্চ পশ্চিম পাকিস্তানি কর্তৃক গণহত্যার পূর্বে ৫২ সালের ভাষা আন্দোলন,৫৪ সালের যুক্তফ্রন্ট নির্বাচন, ৬৬ সালের ৬ দফা আন্দোলন ও ৭০ এর নির্বাচন পাকিদের ভিত নাড়িয়ে দেয়।এই থেকেই পাকিদের ভয়ের কারন হয়ে দাঁড়ায় কখন না জানি বাংলাদেশ স্বাধীনতার ডাক দিয়ে বসে!এ থেকেই পাকিরা ২৬শে মার্চ স্বাধীনতার ঘোষণার একদিন পূর্বেই পূর্বপরিকল্পিতভাবে ২৫ এ মার্চ রাতে এক হত্যাযজ্ঞের মিশনে নেমে পরে যা ইতিহাসে গণহত্যা নামে এবং বাঙালিদের জীবনে কালরাত নামে লিপিবদ্ধ হয়।১৯৭১ সালের ২৫শে মার্চ বাঙ্গালী জীবনে এক ভয়াবহ নির্মম হত্যাকান্ডের রাত,যা ইতিহাসে কালরাত বা গণহত্যার রাত বলে স্বীকৃতি পায়। আমাদের জাতীয় জীবনে একটি ভয়াবহ বীভৎস বর্বরতার দিন ২৫শে মার্চ ১৯৭১।পাকিস্তান শাসকগোষ্ঠী কর্তৃক ৫৬ হাজার বর্গমাইলের দেশ বাংলাদেশের মানুষের ওপর নিষ্ঠুর হত্যাযজ্ঞ চালায় যা ইতিহাসে গণহত্যা হিসেবে পরিচিতি লাভ করে।পাকিরা ২৫ শে মার্চ দিবাগত রাতে প্রথম প্রহরে অপারেশন সার্চলাইট নামে যে গণহত্যা চালায় তাতে হাজার হাজার মানুষ মৃত্যুবরণ করে।ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়, ঢাকা মেডিকেল কলেজ, রাজারবাগ পুলিশ লাইন, সেনানিবাস,পিলখানাস্থ পূর্ব পাকিস্তান রাইফেলসের( ইপিআর) সদর দফতর ,খিলগাঁওয়ের আনসার সদরদপ্তরেও সশস্ত্র হামলা চালিয়ে অগণিত মানুষ হত্যা করে।তাদের হাতে বন্দী হয় ৮০০ ইপিআর অফিসার ও জওয়ান। এদের অনেককেই নির্মমভাবে হত্যা করা হয়।পাকিরা ট্যাঙ্ক দিয়ে ঢাকা শহর ঘিরে রাখে,মেশিনগানের গুলিতে বাড়িঘর বিধ্বস্ত হয়।
কী নির্মম নিষ্ঠুরতম হত্যাযজ্ঞ!পাকিরা মধ্যরাতে ঢাবির শিক্ষকদের বাসভবন ও ছাত্রদের আবাসিক হলগুলোতে হামলা চালায়। তাদের উদ্দেশ্য ছিল বাঙ্গালী জাতিকে মেধাহীন করা;এতে কয়েকশত ছাত্র -শিক্ষক ও কর্মকর্তা-কর্মচারী শহীদ হন।অনেক ঘরবাড়ি ও পত্রিকার অফিস জ্বালিয়ে দেওয়া হয়।অগ্নিসংযোগ করা হয় হিন্দু অধ্যুষিত শাঁখারি পট্টি ও তাঁতিবাজারের অসংখ্য ঘরবাড়ি। হত্যাকান্ডের শুরুর প্রথম তিনদিনে ঢাকা, চট্টগ্রাম, যশোর, ময়মনসিংহ, কুষ্টিয়া ও অন্যান্য শহরে ৫০ হাজারের বেশি নর-নারী ও শিশু প্রাণ হারায়।ঢাকার প্রায় ১০ লাখ ভয়ার্ত মানুষ গ্রামে গিয়ে আশ্রয় নেয়। আসলে পাকিরা সবসময় ভয়েই ছিল;কখন না জানি বাংলাদেশ তাদের শাসন থেকে মুক্তির জন্য আন্দোলন করে বসে!কারন তারা দেখেছে ১৯৫২ সালের ২১ শে ফেব্রুয়ারি বাংলাদেশের বাঙালিদের ভাষা আন্দোলন। কিভাবে রাজপথ রক্তে রঞ্জিত করে মাতৃভাষা বাংলাকে রাষ্ট্রভাষা হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করেছে। পাকিস্তান শাসকগোষ্ঠীর রক্তচক্ষুকে উপেক্ষা করে ২৬ শে মার্চ বাংলাদেশের নেতৃত্বদানকারী নেতৃবৃন্দের ডাকে নিরস্ত্র বাঙ্গালীরা পাকিস্তানিদের বিরুদ্ধে যুদ্ধে ঝাঁপিয়ে পড়ে।শুরু হয় স্বাধীনতার জন্য আন্দোলন। বাংলাদেশ ঘটনাপ্রবাহের এক নির্মম সত্য ইতিহাস ফি-বছর ঘুরে ফিরে আসে আমাদের সামনে।
মোহাম্মদ জিয়াদ হোসেন
প্রভাষক,বাংলা
সরকারি হিজলা ডিগ্রি কলেজ
হিজলা,বরিশাল
ইমেইল:[email protected]
১
১ মন্তব্য