সহকারী শিক্ষক
১৯ মার্চ, ২০২৬ ০৯:৫২ পূর্বাহ্ণ
শিক্ষায় ভর্তি: লটারি বনাম পরীক্ষা – মেধার বিভাজন নাকি সুযোগের সাম্য?
প্রাথমিক শিক্ষায় ভর্তি: লটারি বনাম পরীক্ষা – মেধার বিভাজন নাকি সুযোগের সাম্য?
শিক্ষা জীবনের প্রথম প্রহরেই কোমলমতি শিশুদের ঘাড়ে চাপিয়ে দেওয়া হচ্ছে প্রতিযোগিতার এক অসম বোঝা। প্রথম শ্রেণিতে ভর্তির জন্য তথাকথিত "ভর্তি পরীক্ষা" নামক এক অদ্ভুতুড়ে ব্যবস্থার মাধ্যমে কচি মুখগুলোকে বাধ্য করা হচ্ছে এক অসম লড়াইয়ে অবতীর্ণ হতে। যে বয়সে একটি শিশুর হাতে থাকার কথা ছিল খেলার পুতুল, ছবি আঁকার রঙিন পেন্সিল, সেই বয়সে তাদের হাতে ধরিয়ে দেওয়া হচ্ছে কঠিন সব প্রশ্নপত্র। এই ভর্তি পরীক্ষার মাধ্যমে আসলে কী যাচাই করতে চাই আমরা? কে বেশি মুখস্থ করতে পারে, কার অভিভাবক বেশি সচেতন, নাকি কার কোচিং সেন্টার বেশি নামকরা? এই প্রশ্নগুলো আজ বিবেকবান প্রতিটি মানুষের মনে উঁকি দিচ্ছে। আপাতদৃষ্টিতে মনে হতে পারে, ভর্তি পরীক্ষার মাধ্যমে মেধাবী শিক্ষার্থীদের খুঁজে বের করে তাদের জন্য একটি বিশেষায়িত শিক্ষার পরিবেশ তৈরি করা হচ্ছে। কিন্তু এর গভীরে তাকালেই বেরিয়ে আসে এক বৈষম্যমূলক এবং বিভাজন সৃষ্টিকারী ব্যবস্থার কদর্য রূপ।
ভর্তি পরীক্ষা: বৈষম্যের প্রথম পাঠ
জন্মগতভাবে প্রতিটি শিশুই অপার সম্ভাবনা নিয়ে পৃথিবীতে আসে। তাদের মেধা এবং যোগ্যতার বিচার করার মতো বয়স বা পরিস্থিতি কোনটিই তখন তৈরি হয় না। অথচ প্রথম শ্রেণির ভর্তি পরীক্ষার নামে আমরা তাদের কপালে "মেধাবী" এবং "অমেধাবী"র তকমা সেঁটে দিচ্ছি। যে শিশুটি হয়তো তথাকথিত পরীক্ষায় ভালো করতে পারলো না, তার মনের মধ্যে শিক্ষা জীবনের শুরুতেই এক ধরনের হীনমন্যতার বীজ বপন করে দেওয়া হচ্ছে। তাকে বুঝিয়ে দেওয়া হচ্ছে, সে অন্যদের চেয়ে পিছিয়ে আছে। এই মানসিক আঘাত শিশুটির ভবিষ্যৎ শিক্ষাজীবনের জন্য কতটা ক্ষতিকর, তা কি আমরা ভেবে দেখেছি?
বিশিষ্ট শিক্ষাবিদ অধ্যাপক সিরাজুল ইসলাম চৌধুরী এই প্রসঙ্গে বলেন, "প্রাথমিক স্তরে ভর্তি পরীক্ষা শিশুদের জন্য এক ধরনের মানসিক নির্যাতন। এই পরীক্ষা শিশুদের মধ্যে বৈষম্য তৈরি করে এবং তাদের স্বাভাবিক বিকাশকে বাধাগ্রস্ত করে।" তাঁর এই কথার প্রতিধ্বনি শোনা যায় অনেক শিশু বিশেষজ্ঞ এবং শিক্ষাবিদের কণ্ঠেই। তাঁদের মতে, এই ভর্তি পরীক্ষা কেবল শিক্ষার্থীদের মধ্যেই নয়, অভিভাবকদের মধ্যেও এক অসুস্থ প্রতিযোগিতার জন্ম দেয়। ভালো স্কুলে সন্তানকে ভর্তি করানোর জন্য অভিভাবকরা লক্ষ লক্ষ টাকা খরচ করে কোচিং সেন্টারে পাঠাচ্ছেন, যা শিক্ষাকে একটি বাণিজ্যিক পণ্যে পরিণত করেছে।
লটারি প্রথা: সুযোগের সমতার দিকে এক ধাপ
এর বিপরীতে, লটারি প্রক্রিয়ার মাধ্যমে ভর্তি ব্যবস্থা এক নতুন দিগন্তের উন্মোচন করেছে। এই ব্যবস্থায় কোনো শিশুর মেধা যাচাইয়ের নামে তাকে অসম প্রতিযোগিতায় ঠেলে দেওয়া হয় না। এখানে ধনী-দরিদ্র, মেধাবী-সাধারণ নির্বিশেষে প্রতিটি শিশুর জন্য সমান সুযোগ তৈরি হয়। লটারির মাধ্যমে বিভিন্ন মেধা এবং সামাজিক প্রেক্ষাপট থেকে আসা শিক্ষার্থীরা একই শ্রেণিকক্ষে পড়ার সুযোগ পায়। এর ফলে তাদের মধ্যে পারস্পরিক মিথস্ক্রিয়া বাড়ে, একে অপরকে জানার এবং বোঝার সুযোগ তৈরি হয়। শিশুরা শিখতে পারে কিভাবে ভিন্ন ভিন্ন যোগ্যতার বন্ধুদের সাথে মিলেমিশে থাকতে হয়, যা তাদের সামাজিক দক্ষতা বৃদ্ধিতে সহায়তা করে।
সাবেক তত্ত্বাবধায়ক সরকারের উপদেষ্টা এবং গণসাক্ষরতা অভিযানের নির্বাহী পরিচালক রাশেদা কে. চৌধুরী বলেন, "লটারির মাধ্যমে ভর্তি শিশুদের মধ্যে বিভাজন তৈরি করে না, বরং অন্তর্ভুক্তিমূলক শিক্ষার পরিবেশ নিশ্চিত করে। এতে করে শিক্ষকদের প্রকৃত যোগ্যতারও প্রমাণ পাওয়া যায়।" সত্যিই তাই, একজন শিক্ষকের সার্থকতা তো সেখানেই, যেখানে তিনি একদল সাধারণ শিক্ষার্থীকে নিজ হাতে গড়েপিটে অসাধারণ করে তোলেন। আগে থেকে বাছাই করা মেধাবী শিক্ষার্থীদের পড়িয়ে ভালো ফলাফল করানোতে শিক্ষকের কৃতিত্ব কতটুকু, সেই প্রশ্ন থেকেই যায়। মেধার পরীক্ষা তো তখনই হবে, যখন একজন শিক্ষক লটারির মাধ্যমে পাওয়া বিভিন্ন স্তরের শিক্ষার্থীদের নিয়ে কাজ করে প্রতিষ্ঠানের সুনাম অক্ষুণ্ণ রাখতে পারবেন।
শিক্ষকের প্রকৃত যোগ্যতা এবং প্রতিষ্ঠানের দায়বদ্ধতা
যে সকল প্রতিষ্ঠান ভর্তি পরীক্ষার মাধ্যমে শিক্ষার্থী বাছাই করে নিজেদের "সেরা" বলে দাবি করে, তাদের কাছে প্রশ্ন রাখা যেতে পারে, যদি আপনারা এতটাই সেরা হবেন, তবে কেন লটারির মাধ্যমে বিভিন্ন স্তরের শিক্ষার্থী ভর্তি করিয়ে তাদের ভালো ফলাফল করাতে পারছেন না? এখানেই লুকিয়ে আছে আসল সত্য। অনেক ক্ষেত্রেই দেখা যায়, এই প্রতিষ্ঠানগুলো শুধুমাত্র বাছাই করা মেধাবীদের নিয়ে কাজ করে নিজেদের সাফল্যের বিজ্ঞাপন দেয়, কিন্তু শিক্ষার প্রকৃত আলো সবার মাঝে ছড়িয়ে দেওয়ার যে মহান দায়িত্ব, তা তারা এড়িয়ে যায়।
রাষ্ট্রের উচিত এই বৈষম্যমূলক ভর্তি পরীক্ষা ব্যবস্থা পুরোপুরি বিলুপ্ত করে সকল প্রাথমিক বিদ্যালয়ে লটারির মাধ্যমে ভর্তি নিশ্চিত করা। এতে করে কয়েকটি সুবিধা পাওয়া যাবে:
বৈষম্য হ্রাস: ধনী-দরিদ্র এবং বিভিন্ন সামাজিক স্তর থেকে আসা শিশুদের মধ্যে শিক্ষার সুযোগের সমতা আসবে।
মানসিক চাপ মুক্তি: শিশুরা শিক্ষা জীবনের শুরুতেই প্রতিযোগিতার নির্মম চাপ থেকে মুক্তি পাবে এবং তাদের স্বাভাবিক শৈশব ব্যাহত হবে না।
শিক্ষার প্রকৃত মূল্যায়ন: শিক্ষক এবং শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলোর প্রকৃত যোগ্যতা যাচাইয়ের সুযোগ তৈরি হবে। তারা কতটা সফলভাবে বিভিন্ন স্তরের শিক্ষার্থীদের পাঠদান করতে পারছে, তার ওপর ভিত্তি করে তাদের মূল্যায়ন করা হবে।
সামাজিকীকরণ: বিভিন্ন প্রেক্ষাপট থেকে আসা শিক্ষার্থীরা একসাথে বেড়ে ওঠার সুযোগ পাওয়ায় তাদের মধ্যে সামাজিক বন্ধন দৃঢ় হবে।
পরিশেষে বলা যায়, প্রাথমিক শিক্ষা কোনো প্রতিযোগিতার ক্ষেত্র নয়, এটি প্রতিটি শিশুর অধিকার। ভর্তি পরীক্ষার নামে এই অধিকারকে সংকুচিত করার কোনো সুযোগ নেই। রাষ্ট্রকে নিশ্চিত করতে হবে যেন প্রতিটি শিশু কোনো ধরনের বৈষম্য ছাড়াই তার শিক্ষা জীবন শুরু করতে পারে। লটারি প্রক্রিয়াই হতে পারে সেই পথে এগিয়ে যাওয়ার প্রথম এবং সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ। আমাদের শিশুদের শেখাতে হবে যে, তারাও পারে, তারা সবাই সমান এবং তাদের চেষ্টার মাধ্যমেই তারা নিজেদের প্রতিষ্ঠা করতে পারবে। এই বিশ্বাসটুকু তাদের মনে গেঁথে দিতে পারলেই একটি বৈষম্যহীন এবং সমৃদ্ধ আগামীর বাংলাদেশ গড়া সম্ভব হবে।
১
১ মন্তব্য