Loading..

ব্লগ

রিসেট

১৭ মার্চ, ২০২৬ ০৪:২৫ অপরাহ্ণ

তারা কি দেখে না, আমি তাদের পূর্বে বহু প্রজন্মকে ধ্বংস করেছি? যাদেরকে যমীনে এমনভাবে প্রতিষ্ঠিত করেছিলাম যেভাবে তোমাদেরকে প্রতিষ্ঠিত করিনি। আর তাদের উপর বৃষ্টি পাঠিয়েছিলাম মুষলধারে


তারা কি দেখে না, আমি তাদের পূর্বে বহু প্রজন্মকে ধ্বংস করেছি? যাদেরকে যমীনে এমনভাবে প্রতিষ্ঠিত করেছিলাম যেভাবে তোমাদেরকে প্রতিষ্ঠিত করিনি। আর তাদের উপর বৃষ্টি পাঠিয়েছিলাম মুষলধারে এবং সৃষ্টি করেছিলাম নদীসমূহ যা তাদের নীচে প্রবাহিত হত। অতঃপর তাদের পাপের কারণে তাদেরকে ধ্বংস করেছি এবং তাদের পরে অন্য প্রজন্মকে সৃষ্টি করেছি।

সূরাঃ আল-আন'আম আয়াতঃ ১-৬ মাক্কী

اَلۡحَمۡدُ لِلّٰهِ الَّذِیۡ خَلَقَ السَّمٰوٰتِ وَ الۡاَرۡضَ وَ جَعَلَ الظُّلُمٰتِ وَ النُّوۡرَ ۬ؕ ثُمَّ الَّذِیۡنَ كَفَرُوۡا بِرَبِّهِمۡ یَعۡدِلُوۡن﴾

সকল প্রশংসা আল্লাহর জন্য যিনি সৃষ্টি করেছেন আসমান ও যমীন এবং সৃষ্টি করেছেন অন্ধকার ও আলো। তারপর কাফিররা তাদের রবের সমতুল্য স্থির করে।

-আল-বায়ান

সমস্ত প্রশংসা আল্লাহর জন্য যিনি আসমানসমূহ ও যমীন সৃষ্টি করেছেন আর সৃষ্টি করেছেন অন্ধকার ও আলো, এতদসত্ত্বেও যারা কুফরী করেছে তারা (অন্যকে) তাদের প্রতিপালকের সমকক্ষ দাঁড় করিয়েছে।

-তাইসিরুল

সমস্ত প্রশংসা আল্লাহরই জন্য যিনি আকাশসমূহ ও পৃথিবী সৃষ্টি করেছেন এবং সৃষ্টি করেছেন আলো ও অন্ধকার; এ সত্ত্বেও যারা কাফির হয়েছে তারা অপর কিছুকে তাদের রবের সমকক্ষ নিরূপণ করেছে।

-মুজিবুর রহমান

[All] praise is [due] to Allah, who created the heavens and the earth and made the darkness and the light. Then those who disbelieve equate [others] with their Lord.

-Sahih International

১. সকল প্রশংসা আল্লাহরই(১) যিনি আসমান ও যমীন সৃষ্টি করেছেন, আর সৃষ্টি করেছেন অন্ধকার ও আলো।(২) এরপরও কাফেরগণ তাদের রব-এর সমকক্ষ দাঁড় করায়।(৩)

(১) এ সূরাটিকে (الْحَمْدُ لِلَّهِ) বাক্য দ্বারা আরম্ভ করা হয়েছে। এতে খবর দেয়া হয়েছে যে, সর্ববিধ প্রশংসা আল্লাহর জন্য। এ খবরের উদ্দেশ্য মানুষকে প্রশংসা শিক্ষা দেয়া। যেন বলা হচ্ছে, হে মানুষ! তোমরা তার জন্যই যাবতীয় হামদ ও শোকর নির্দিষ্ট কর, যিনি তোমাদেরকে সৃষ্টি করেছেন, আরও সৃষ্টি করেছেন আসমান ও যমীন। তাঁর সাথে কাউকেও সামান্যতম অংশীদারও করবে না। এ বিশেষ পদ্ধতি শিক্ষাদানের মধ্যে এদিকেও ইঙ্গিত করা হয়েছে যে, পরিপূর্ণ হামদ বা প্রশংসা একমাত্র তাঁরই, যার কোন শরীক নেই। তাকে ব্যতীত আর যে সমস্ত উপাস্যের ইবাদাত করা হয়, তারা এ হামদ প্রাপ্য নয়। [তাবারী] সুতরাং কেউ প্রশংসা করুক বা না করুক, তিনি স্বীয় ওজুদ বা সত্তার পরাকাষ্ঠার দিক দিয়ে নিজেই প্রশংসনীয়। এ বাক্যের পর আসমান ও যমীন এবং অন্ধকার ও আলো সৃষ্টি করার কথা উল্লেখ করে তার প্রশংসনীয় হওয়ার প্রমাণও ব্যক্ত করা হয়েছে যে, যে সত্তা এহেন মহান শক্তি-সামর্থ্য ও বিজ্ঞবান, তিনিই হামদ বা প্রশংসার যোগ্য হতে পারেন। কাতাদা বলেন, এ আয়াত থেকে বুঝা যায় যে, আল্লাহ্ তা'আলা আসমানকে যমীনের পূর্বে, অন্ধকারকে আলোর পূর্বে এবং জান্নাতকে জাহান্নামের পূর্বে সৃষ্টি করেছেন। [তাবারী]

(২) এ আয়াতে سماوات শব্দটিকে বহুবচনে এবং أرض শব্দটিকে একবচনে উল্লেখ করা হয়েছে। যদিও অন্য এক আয়াতে উল্লেখ করা হয়েছে যে, আসমানের ন্যায় যমীনও সাতটি। [যেমন, সূরা আত-তালাক ১২] এমনিভাবে ظلمات শব্দটিকে বহুবচনে এবং نور শব্দটিকে একবচনে উল্লেখ করার মাঝে ইঙ্গিত রয়েছে যে, نور বলে বিশুদ্ধ সরল পথ ব্যক্ত করা হয়েছে এবং তা মাত্র একটিই। আর ظلمات বলে ভ্রান্ত পথ ব্যক্ত করা হয়েছে, যা অসংখ্য। তাছাড়া نور বা আলো ظلمات বা অন্ধকার থেকে উত্তম। [বাহরে মুহীত, ইবন কাসীর]

(৩) আলোচ্য আয়াতের উদ্দেশ্য একত্ববাদের স্বরূপ ও সুস্পষ্ট প্রমাণ বর্ণনা করে জগতের ঐসব জাতিকে হুশিয়ার করা যারা মূলতঃ একত্ববাদে বিশ্বাসী নয় কিংবা বিশ্বাসী হওয়া সত্বেও একত্ববাদের তাৎপর্যকে পরিত্যাগ করে বসেছে। অগ্নি উপাসকদের মতে জগতের স্রষ্টা দু’জন - ইয়াযদান ও আহরামান। তারা ইয়াযদানকে মঙ্গলের স্রষ্টা এবং আহরামানকে অমঙ্গলের স্রষ্টা বলে বিশ্বাস করে। এ দুটিকেই তারা অন্ধকার ও আলো বলে ব্যক্ত করে। এমনিভাবে নাসারারা একত্ববাদে বিশ্বাসী হওয়ার সাথে সাথে ঈসা আলাইহিস সালাম ও তার মাতা মারইয়াম আলাইহাস সালাম-কে আল্লাহ তা'আলার অংশীদার সাব্যস্ত করেছে। এরপর একত্ববাদের বিশ্বাসকে টিকিয়ে রাখার জন্য তারা ‘একে তিন’ এবং ‘তিনে এক’ এর অযৌক্তিক মতবাদের আশ্রয় নিয়েছে। আরবের মুশরিকরা প্রতিটি পাহাড়ের প্রতিটি বড় পাথরকেও তাদের উপাস্য বানিয়েছে। [আল-মানার]

মোটকথা, যে মানবকে আল্লাহ তা'আলা আশরাফুল মাখলুকাত তথা সৃষ্টির সেরা করেছিলেন, তারা যখন পথভ্রষ্ট হল, তখন চন্দ্র, সূর্য, তারকারাজি, আকাশ, পানি, বৃক্ষলতা এমনকি পোকা-মাকড়কেও সিজদার যোগ্য উপাস্য, রুযীদাতা ও বিপদ বিদূরণকারী সাব্যস্ত করে নিল। কুরআনুল কারীমের আলোচ্য আয়াত আল্লাহ তা'আলাকে যমীন ও আসমানের স্রষ্টা এবং অন্ধকার ও আলোর উদ্ভাবক বলে উপরোক্ত সব ভ্রান্ত বিশ্বাসের মূলোৎপাটন করেছে। কেননা, অন্ধকার ও আলো, আসমান ও যমীন এবং এতে উৎপন্ন যাবতীয় বস্তু আল্লাহ্ তা'আলার সৃষ্ট। অতএব, এগুলোকে কেমন করে আল্লাহ্ তা'আলার অংশীদার করা যায়? যিনি সৃষ্টি করেন তিনি কি যারা সৃষ্টি করতে পারে না তাদের মত? সুতরাং কিভাবে ইবাদাতে ও সম্মানে তাঁর সমকক্ষ কাউকে দাড় করানো যায়? [ইবন কাসীর, ফাতহুল কাদীর]

তাফসীরে জাকারিয়া

(১) প্রশংসা আল্লাহরই যিনি আকাশ ও পৃথিবী সৃষ্টি করেছেন, আর সৃষ্টি করেছেন অন্ধকার ও আলো।[1] এতদসত্ত্বেও অবিশ্বাসীগণ তাদের প্রতিপালকের সমকক্ষ স্থির করে। [2]

[1] ظُلُمَات বলতে রাতের অন্ধকার এবং نُور বলতে দিনের আলো বুঝানো হয়েছে। অথবা কুফরীর অন্ধকার এবং ঈমানের জ্যোতি বুঝানো হয়েছে। ‘নূর’ (জ্যোতি) একবচন এবং ‘যুলুমাত’ (অন্ধকার) বহুবচন ব্যবহার করা হয়েছে। কারণ, অন্ধকারের কারণ অনেক এবং তার প্রকারাদিও বিভিন্ন। পক্ষান্তরে ‘নূর’ (জ্যোতি)র উল্লেখ জিন্‌স (জাত) স্বরূপ করা হয়েছে, যা তার সমস্ত প্রকারকে নিজের মধ্যে শামিল করে নেয়। (ফাতহুল ক্বাদীর) আবার এটাও হতে পারে যে, হিদায়াত এবং ঈমানের রাস্তা যেহেতু একটাই, চার অথবা পাঁচ কিংবা ভিন্ন ভিন্ন নয়, তাই ‘নূর’কে একবচন শব্দে উল্লেখ করা হয়েছে।

[2] অর্থাৎ, তাঁর সাথে অন্যকে শরীক করে।

তাফসীরে আহসানুল বায়ান

শেয়ার লিঙ্ক কপি হয়েছে!

৬ : ২ هُوَ الَّذِیۡ خَلَقَكُمۡ مِّنۡ طِیۡنٍ ثُمَّ قَضٰۤی اَجَلًا ؕ وَ اَجَلٌ مُّسَمًّی عِنۡدَهٗ ثُمَّ اَنۡتُمۡ تَمۡتَرُوۡنَ﴾

তিনিই তোমাদেরকে সৃষ্টি করেছেন কাদা মাটি থেকে তারপর নির্ধারণ করেছেন একটি কাল, আর তাঁর কাছে আছে একটি নির্দিষ্ট কাল, তারপর তোমরা সন্দেহ কর।

-আল-বায়ান

যিনি মাটি থেকে তোমাদেরকে সৃষ্টি করেছেন অতঃপর (তোমাদের জীবনের জন্য) একটি নির্দিষ্ট মেয়াদ নির্ধারিত করেছেন, এছাড়া আরেকটি নির্ধারিত মেয়াদ আছে (যে সম্পর্কিত জ্ঞান আছে) তাঁর কাছে, কিন্তু তোমরা সন্দেহই করে চলেছ।

-তাইসিরুল

অথচ তিনি তোমাদের মাটি হতে সৃষ্টি করেছেন, অতঃপর তোমাদের জীবনের জন্য একটি নির্দিষ্ট মেয়াদ নির্ধারণ করেছেন, এছাড়া আরও একটি নির্দিষ্ট মেয়াদ তাঁর নিকট নির্ধারিত রয়েছে, কিন্তু এরপরেও তোমরা সন্দেহ করে থাক।

-মুজিবুর রহমান

It is He who created you from clay and then decreed a term and a specified time [known] to Him; then [still] you are in dispute.

-Sahih International

২. তিনিই তোমাদেরকে কাদামাটি থেকে সৃষ্টি করেছেন(১), তারপর একটা সময় নির্দিষ্ট করেছেন এবং আর একটি নির্ধারিত সময় আছে যা তিনিই জানেন, এরপরও তোমরা সন্দেহ কর(২)।

(১) প্রথম আয়াতে বৃহৎ জগত অর্থাৎ সমগ্র বিশ্বের বৃহত্তম বস্তুগুলোকে আল্লাহ্ তা'আলার সৃষ্ট ও মুখাপেক্ষী বলে মানুষকে নির্ভুল একত্ববাদের শিক্ষা দেয়া হয়েছে। অতঃপর দ্বিতীয় আয়াতে মানুষকে বলা হয়েছে যে, তোমার অস্তিত্ব স্বয়ং একটি ক্ষুদ্র জগৎবিশেষ। যদি এরই সূচনা, পরিণতি ও বাসস্থানের প্রতি লক্ষ্য করা হয়, তবে একত্ববাদ একটা বাস্তব সত্য হয়ে সামনে ফুটে উঠবে। আল্লাহ বলেনঃ “আল্লাহই সে সত্তা যিনি তোমাদেরকে মাটি থেকে সৃজন করেছেন।” আল্লাহ্ তা'আলা আদম আলাইহিস সালাম-কে একটি বিশেষ পরিমাণ মাটি থেকে সৃষ্টি করেছেন। [ইবন কাসীর] সমগ্র পৃথিবীর অংশ এতে অন্তর্ভুক্ত ছিল। এ কারণেই আদম-সন্তানরা বর্ণ, আকার, চরিত্র ও অভ্যাসে বিভিন্ন।

কেউ কৃষ্ণবর্ণ, কেউ শ্বেতবর্ণ, কেউ লালবর্ণ, কেউ কঠোর, কেউ নম্র, কেউ পবিত্র-স্বভাব বিশিষ্ট এবং কেউ অপবিত্র স্বভাবের হয়ে থাকে। হাদীসে এসেছে, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন, আল্লাহ তা'আলা আদমকে এমন এক মুষ্টি মাটি থেকে তৈরী করেছেন যে মুষ্টি সমস্ত মাটি থেকে নেয়া হয়েছে। তাই আদম সন্তান মাটির মতই হয়েছে। তাদের মধ্যে লাল, সাদা, কালো, আবার এর মাঝামাঝি রয়েছে। তাদের মধ্যে কেউ নম্র, কেউ চিন্তাগ্রস্ত, কেউ মন্দ, কেউ ভাল, কেউ এর মাঝামাঝি পর্যায়ের রয়েছে। [আবুদাউদ: ৪৬৯৩]

(২) পূর্বে আদমসন্তানদের সৃষ্টির সূচনা বর্ণনা করা হয়েছে। এখন এর পরিণতির দুটি মঞ্জিল উল্লেখ করা হয়েছে। একটি মানবের ব্যক্তিগত পরিণতি, যাকে মৃত্যু বলা হয়। অপরটি সমগ্র মানবগোষ্ঠীর ও তার উপকারে নিয়োজিত সৃষ্টিজগত- সবার সামষ্টিক পরিণতি, যাকে কেয়ামত বলা হয়। প্রথমটির ব্যাপারে বলেছেন, (ثُمَّ قَضَىٰ أَجَلًا) অর্থাৎ মানব সৃষ্টির পর আল্লাহ্ তা'আলা তার স্থায়িত্ব ও আয়ুস্কালের জন্য একটি মেয়াদ নির্ধারণ করে দিয়েছেন। এ মেয়াদের শেষ প্রান্তে পৌছার নাম মৃত্যু। এ মেয়াদ মানবের জানা না থাকলেও এর প্রকৃতি সম্পর্কে মানুষ অবগত। কেননা, সে সর্বদা, সর্বত্র আশ-পাশের আদম-সন্তানদেরকে মারা যেতে দেখে। এরপর সমগ্র বিশ্বের পরিণতি অর্থাৎ কেয়ামতের উল্লেখ করে বলা হয়েছে, “আরো একটি মেয়াদ নির্দিষ্ট আছে, যা একমাত্র তার কাছেই” অর্থাৎ আল্লাহই জানেন, এ মেয়াদের পূর্ণ জ্ঞান ফিরিশতাদের নেই এবং মানুষেরও নেই।

সারকথা এই যে, প্রথম আয়াতে বৃহৎ জগত অর্থাৎ গোটা বিশ্বের অবস্থা সম্পর্কে বলা হয়েছে যে, তা আল্লাহ্ তাআলা কর্তৃক সৃষ্ট ও নির্মিত। দ্বিতীয় আয়াতে এমনিভাবে ক্ষুদ্র জগৎ অর্থাৎ মানুষ যে আল্লাহর সৃষ্টজীব, তা বর্ণিত হয়েছে। এরপর মানুষকে শৈথিল থেকে জাগ্রত করার জন্য বলা হয়েছে যে, প্রত্যেক মানুষের একটি বিশেষ আয়ুষ্কাল রয়েছে, যার পর তার মৃত্যু অবধারিত। প্রতিটি মানুষ এ বিষয়টি সর্বক্ষণ নিজের আশ-পাশে প্রত্যক্ষ করে। এটা যেহেতু সত্য, সেহেতু এরপরও আরেকটি সময় তাদের জন্য নির্ধারিত রয়েছে। যার ঘোষণা আল্লাহ নিজেই দিয়েছেন। সুতরাং এ ব্যাপারে সন্দেহ থাকতে পারে না। [ইবন কাসীর, সা’দী, আল-মুনীর, ফাতহুল কাদীর, আত-তাহরীর ওয়াত তানওয়ীর] এ কারণে আয়াতের শেষভাগে কিয়ামতের উপযুক্ততা প্রকাশার্থে বলা হয়েছে (ثُمَّ أَنْتُمْ تَمْتَرُونَ) অর্থাৎ এহেন সুস্পষ্ট যুক্তি-প্রমাণ সত্বেও তোমরা কেয়ামত সম্পর্কে সন্দেহ পোষণ কর! এটা অনুচিত।

তাফসীরে জাকারিয়া

(২) তিনি তোমাদেরকে মাটি হতে সৃষ্টি করেছেন,[1] অতঃপর একটি কাল নির্দিষ্ট করেছেন[2] এবং আর একটি নির্ধারিত সময়সীমা আছে যা তিনিই জ্ঞাত,[3] তারপরেও তোমরা সন্দেহ কর।[4]

[1] অর্থাৎ, তোমাদের পিতা আদম (আঃ)-কে যিনি তোমাদের মূল এবং যাঁর থেকেই তোমাদের আবির্ভাব ঘটেছে। এর আর একটি অর্থ এও হতে পারে যে, তোমরা যে খাদ্য খাও তা সবই মাটি থেকেই জন্মায় এবং সেই খাদ্য থেকেই বীর্য তৈরী হয়; যা মায়ের গর্ভাশয়ে গিয়ে মানুষ সৃষ্টির কারণ হয়। এই হিসাবে তোমাদেরও সৃষ্টি মাটি থেকেই।

[2] অর্থাৎ, মৃত্যুর।

[3] অর্থাৎ, কিয়াতের সময়। এর জ্ঞান কেবল আল্লাহই রাখেন। অর্থাৎ, প্রথম ‘আজাল’ (নির্দিষ্টকাল) বলতে জন্ম থেকে নিয়ে মৃত্যু পর্যন্ত মানুষের বয়সকে বুঝানো হয়েছে। আর দ্বিতীয় ‘আজাল মুসাম্মা’ (নির্ধারিত সময়সীমা) বলতে মানুষের মৃত্যু থেকে নিয়ে কিয়ামত সংঘটিত হওয়া পর্যন্ত দুনিয়ার সম্পূর্ণ বয়সকে বুঝানো হয়েছে। যার পর সে সম্পূর্ণ রূপে বিনাশ হয়ে যাবে এবং দ্বিতীয় আর এক দুনিয়া অর্থাৎ, আখেরাতের জীবন শুরু হয়ে যাবে।

[4] অর্থাৎ, কিয়ামত সংঘটিত হওয়ার ব্যাপারে। যেমন, কাফের ও মুশরিকরা বলত যে, ‘যখন আমরা মরে মাটিতে মিশে যাব, তখন কিভাবে আমাদেরকে পুনরায় জীবিত করা সম্ভব হবে?’ মহান আল্লাহ বলেন, ‘যে সত্তা তোমাদেরকে প্রথমবার সৃষ্টি করেছে, সেই সত্তাই তোমাদেরকে দ্বিতীয়বার জীবিত করবে।’ (সূরা ইয়াসীন ৭৮-৭৯)

তাফসীরে আহসানুল বায়ান

শেয়ার লিঙ্ক কপি হয়েছে!

وَ هُوَ اللّٰهُ فِی السَّمٰوٰتِ وَ فِی الۡاَرۡضِ ؕ یَعۡلَمُ سِرَّكُمۡ وَ جَهۡرَكُمۡ وَ یَعۡلَمُ مَا تَكۡسِبُوۡنَ ﴿﴾

আর আসমানসমূহ ও যমীনে তিনিই আল্লাহ, তিনি জানেন তোমাদের গোপন ও প্রকাশ্য এবং জানেন যা তোমরা অর্জন কর।

-আল-বায়ান

আসমানসমূহ আর যমীনে তিনিই আল্লাহ, তোমাদের গোপন বিষয়াদি আর তোমাদের প্রকাশ্য বিষয়াদি সম্পর্কে তিনি জানেন, আর তিনি জানেন যা তোমরা উপার্জন কর।

-তাইসিরুল

আকাশসমূহ ও পৃথিবীতে ঐ এক আল্লাহই রয়েছেন, তোমাদের অপ্রকাশ্য ও প্রকাশ্য সব অবস্থাই তিনি জানেন, আর তোমরা যা কিছু কর তাও তিনি পূর্ণরূপে অবগত আছেন।

-মুজিবুর রহমান

 

And He is Allah, [the only deity] in the heavens and the earth. He knows your secret and what you make public, and He knows that which you earn.

-Sahih International

৩. আর আসমানসমূহ ও যমীনে তিনিই আল্লাহ(১), তোমাদের গোপন ও প্রকাশ্য সবকিছু তিনি জানেন এবং তোমরা যা অর্জন কর তাও তিনি জানেন।(২)

(১) এ আয়াতের অনুবাদে কোন প্রকার ভুল বুঝার অবকাশ নেই। মহান আল্লাহ তার আরশের উপরই রয়েছেন। আসমান ও যমীনের সর্বত্রই তার দৃষ্টি, জ্ঞান ও ক্ষমতা রয়েছে। তিনি সর্বত্রই মা’বুদ। আয়াতের এক অর্থ এটাই। কোন কোন মুফাসসির অর্থ করেছেন, তিনিই আল্লাহ যিনি আসমান ও যমীনের যত গোপন ও প্রকাশ্য সবকিছু জানেন। আবার কোন কোন মুফাসসির বলেছেন, এখানে আসমান বলে ঊর্ধ্বজগত বোঝানো হয়েছে। সেটা আরশও হতে পারে। সুতরাং আয়াতের অনুবাদ হবে, তিনিই আল্লাহ যিনি আসমানে তথা আরশের উপর রয়েছেন, সেখানে থাকলেও যমীনের যত গোপন ও প্রকাশ্য বিষয়াদি রয়েছে সব কিছু জানেন। [তাবারী, বাগভী, কুরতুবী, ইবন কাসীর, ফাতহুল কাদীর]

(২) এ আয়াতে প্রথম দু’আয়াতে বর্ণিত বিষয়বস্তুর ফলাফল বর্ণিত হয়েছে। তা এই যে, আল্লাহ তা'আলাই এমন এক সত্তা, যিনি আসমান ও যমীনে ইবাদাত ও আনুগত্যের যোগ্য এবং তিনিই তোমাদের প্রতিটি প্রকাশ্য ও গোপন অবস্থা এবং প্রতিটি উক্তি ও কর্ম সম্পর্কে পুরোপুরি পরিজ্ঞাত। সুতরাং তোমরা আল্লাহ ব্যতীত আর কারও ইবাদাত করো না। তিনি যেহেতু তোমাদের গোপন ও প্রকাশ্য সবই জানেন সুতরাং তার নাফরমানী করা থেকে সতর্কতা অবলম্বন করো এবং এমন কাজ করবে, যা তোমাদেরকে তাঁর নৈকট্য প্রদান করবে, তাঁর রহমতের অধিকারী করবে। এমন কোন কাজ করো না, যাতে তার নৈকট্য থেকে দূরে সরে যাও। [সা'দী]

তাফসীরে জাকারিয়া

(৩) আকাশ ও পৃথিবীর তিনিই আল্লাহ। তোমাদের গোপন ও প্রকাশ্য সব কিছু তিনি জানেন এবং তোমরা যা কর, তাও তিনি অবগত আছেন।[1]

[1] আহলে সুন্নাহ অর্থাৎ, সালাফদের আকীদা হলো, মহান আল্লাহ তো আরশে সমাসীন; যেভাবে তাঁর সত্তার জন্য সামঞ্জস্যপূর্ণ। কিন্তু তাঁর জ্ঞান সর্বত্র বিরাজমান। অর্থাৎ, কোন জিনিসই তাঁর জ্ঞানের বাইরে নয়। অবশ্য কোন কোন ভ্রান্ত দল আল্লাহর আরশে সমাসীন হওয়াকে মানে না। তারা বলে যে, আল্লাহ সর্বত্র বিরাজমান এবং তারা এই আয়াতের ভিত্তিতেই তাদের (ভ্রান্ত) আকীদা সাব্যস্ত করে। অথচ তাদের আকীদা যেমন ভুল, অনুরূপ তাদের দলীলও সঠিক নয়। কেননা, আয়াতের অর্থ হলো, যে সত্তাকে আসমান ও যমীনে ‘আল্লাহ’ বলে ডাকা হয়, আসমানে ও যমীনে যার রাজত্ব বিস্তৃত এবং আসমান ও যমীনে যাকে সত্য উপাস্য মনে করা হয়, সেই আল্লাহই তোমাদের গোপনীয় ও প্রকাশ্য সমস্ত আমলাদির খবর রাখেন। (ফাতহুল ক্বাদীর) এর আরো ব্যাখা করা হয়েছে, উলামাগণ তা তফসীরের কিতাবগুলোতে দেখতে পারেন। যেমন, তাফসীরে ত্বাবারী, ইবনে কাসীর ইত্যাদি।

তাফসীরে আহসানুল বায়ান

শেয়ার লিঙ্ক কপি হয়েছে!

وَ مَا تَاۡتِیۡهِمۡ مِّنۡ اٰیَۃٍ مِّنۡ اٰیٰتِ رَبِّهِمۡ اِلَّا كَانُوۡا عَنۡهَا مُعۡرِضِیۡنَ﴾

আর তাদের কাছে তাদের রবের আয়াতসমূহের কোন আয়াত আসলেই তারা তা থেকে মুখ ফিরিয়ে নেয়।

-আল-বায়ান

তাদের রব্বের নিদর্শনাবলী হতে এমন কোন নিদর্শন তাদের কাছে আসে না যা থেকে তারা মুখ ফিরিয়ে নেয় না।

-তাইসিরুল

আর তাদের অবস্থা হচ্ছে এই যে, তাদের নিকট তাদের রবের নিদর্শনসমূহ হতে যে কোন নিদর্শনই আসুক না কেন, তা হতেই তারা মুখ ফিরিয়ে নেয়।

-মুজিবুর রহমান

And no sign comes to them from the signs of their Lord except that they turn away therefrom.

-Sahih International

৪. আর তাদের রব-এর আয়াতসমূহের এমন কোন আয়াত তাদের কাছে উপস্থিত হয় না যা থেকে তারা মুখ না ফেরায়।(১)

(১) এ আয়াতে অমনোযোগী মানুষের হঠকারিতা ও সত্যবিরোধী জেদের কথা উল্লেখ করে বলা হয়েছে যে, তাদের কাছে আল্লাহর নিদর্শনাবলী থাকার পাশাপাশি নবী-রাসূলগণ তাদের কাছে আল্লাহ্ তা'আলার একত্ববাদের সুস্পষ্ট যুক্তি-প্রমাণ ও নিদর্শন নিয়ে এসেছেন এবং তা তাদের কাছে স্পষ্টও হয়েছে। তা সত্ত্বেও অবিশ্বাসীরা এ কর্মপন্থা অবলম্বন করে রেখেছে যে, আল্লাহর পক্ষ থেকে তাদের হেদায়াতের জন্য যে কোন নিদর্শন প্রেরণ করা হলে, তারা তা থেকে মুখ ফিরিয়ে নেয়- এ সম্পর্কে মোটেই চিন্তা-ভাবনা করে না। [মুয়াসসার]

তাফসীরে জাকারিয়া

(৪) তাদের প্রতিপালকের নিদর্শনাবলীর মধ্যে এমন কোন নিদর্শন তাদের নিকট উপস্থিত হয় না, যা থেকে তারা মুখ ফেরায় না।

 

তাফসীরে আহসানুল বায়ান

শেয়ার লিঙ্ক কপি হয়েছে!

فَقَدۡ كَذَّبُوۡا بِالۡحَقِّ لَمَّا جَآءَهُمۡ ؕ فَسَوۡفَ یَاۡتِیۡهِمۡ اَنۡۢبٰٓؤُا مَا كَانُوۡا بِهٖ یَسۡتَهۡزِءُوۡنَ ﴾

অতঃপর অবশ্যই তারা সত্যকে অস্বীকার করেছে, যখন তা তাদের কাছে এসেছে। সুতরাং অচিরেই তাদের কাছে সে বিষয়ের সংবাদ আসবে যা নিয়ে তারা উপহাস করত।

-আল-বায়ান

(এখন) যে সত্য তাদের কাছে এসেছে তারা তা অস্বীকার করেছে। শীঘ্রই তাদের কাছে সে খবর আসবে যে সম্পর্কে তারা ঠাট্টা-বিদ্রূপ করত।

-তাইসিরুল

সুতরাং তাদের নিকট যখন সত্য বাণী এসেছে, ওটাও তারা মিথ্যা জেনেছে। অতএব অতি সত্ত্বরই তাদের নিকট সেই বিষয়ের সংবাদ এসে পৌঁছবে, যে ব্যাপারে তারা ঠাট্টা-বিদ্রুপ করত।

-মুজিবুর রহমান

For they had denied the truth when it came to them, but there is going to reach them the news of what they used to ridicule.

-Sahih International

৫. সুতরাং সত্য যখন তাদের কাছে এসেছে তারা তো তাতে মিথ্যারোপ করেছে।(১) অতএব যা নিয়ে তারা ঠাট্টা-বিদ্রুপ করত তার যথার্থ সংবাদ অচিরেই তাদের কাছে পৌছবে।(২)

(১) এ আয়াতে বলা হচ্ছে যে, সত্য যখন তাদের সামনে প্রতিভাত হল, তখন তারা সত্যকে মিথ্যা প্রতিপন্ন করল। এখানে সত্য’র অর্থ কুরআন হতে পারে এবং নবী করীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-ও হতে পারে। [তাবারী, কুরতুবী, ইবন কাসীর, ফাতহুল কাদীর] কেননা, মহানবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম আজীবন আরব গোত্রসমূহের মধ্যেই অবস্থান করেন। তার শৈশব থেকে যৌবন এবং যৌবন থেকে বার্ধক্য তাদের সামনে সুস্পষ্ট হয়ে উঠেছে। তারা এ কথা পুরোপুরিই জানত যে, মহানবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম কোন মানুষের কাছে এক অক্ষরও শিক্ষা লাভ করেননি। এমনকি তিনি নিজ হাতে নিজের নামও লিখতে পারতেন না। সারা আরবে তিনি উম্মি বা নিরক্ষর উপাধিতে খ্যাত ছিলেন। চল্লিশ বছর পূর্ণ হয়ে যেতেই অকস্মাৎ তার মুখ দিয়ে নিগূঢ় তত্ত্ব সম্পন্ন বাণীসমূহের এমন স্রোতধারা প্রবাহিত হতে লাগল, যা জগতের যাবতীয় জ্ঞানী-গুণীদেরকেও বিস্ময়াভিভূত করে দেয়।

তিনি আল্লাহর কালাম কুরআনের মোকাবেলা করার জন্য আরবের স্বনামখ্যাত, প্রাঞ্জলভাষী কবি-সাহিত্যিক ও অলঙ্কারবিদদেরকে চ্যালেঞ্জ করেন। তারা মহানবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-কে হেয় প্রতিপন্ন করার জন্য স্বীয় জান-মাল, মান-সন্ত্রম, সন্তান-সন্ততি ও পরিবার-পরিজন বিসর্জন দিতে সর্বদা প্রস্তুত থাকত। কিন্তু এ চ্যালেঞ্জ গ্রহণ করে কুরআনের একটি আয়াতের অনুরূপ বাক্য রচনা করার সামর্থ্য তাদের কারো হল না। এভাবে নবী করীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম এবং কুরআনের অস্তিত্ব ছিল সত্যের এক বিরাট নিদর্শন। এছাড়া মহানবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর মাধ্যমে হাজারো মু'জিযা ও খোলাখুলি নিদর্শন প্রকাশ পায়, যে কোন সুস্থ বিবেকসম্পন্ন মানুষ যা অস্বীকার করতে পারত না। কিন্তু কাফেররা এসব নিদর্শনকে সুস্পষ্ট মিথ্যা বলে উড়িয়ে দিল।

(২) আয়াতের শেষে কাফেরদের অস্বীকৃতি ও মিথ্যারোপের অশুভ পরিণতির দিকে ইঙ্গিত করে বলা হয়েছে যে, আজ তো এসব অপরিণামদর্শী লোকেরা রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর মু'জিযা, তার আনীত হেদায়াত, কেয়ামত ও আখেরাত সবকিছু নিয়েই হাস্যোপহাস করছে, কিন্তু সে সময় দূরে নয়, যখন এগুলোর স্বরূপ তাদের দৃষ্টিতে প্রতিভাত হবে আর যদি তা না করা হয় তবে যা নিয়ে তারা ঠাট্টাবিদ্রুপ করছে তা দলীল-প্রমাণসহ তাদের সামনে উপস্থিত হবে। এত সাবধানবাণীর পরও কাফেররা তাদের অবস্থান থেকে সরে আসে নি। তাদের পথভ্রষ্টতা থেকে ফিরে আসেনি। শেষপর্যন্ত আল্লাহ্ তা'আলা তার এ ওয়াদা সত্য করে দেখিয়েছেন। বদরের দিন তিনি তাদের উপর তরবারীর মাধ্যমে সে ফয়সালা করে দেন। [তাবারী]

তাছাড়া তাদের বিচারের আরেক ব্যবস্থা রয়েছেই। তা কেয়ামতদিবসে প্রতিষ্ঠিত হবে। সেখানে প্রত্যেককে তার ঈমান ও আমলের হিসাব দিতে হবে এবং প্রত্যেক ব্যক্তি নিজ নিজ কর্মের পুরস্কার ও শাস্তি পাবে। তখন এগুলোকে বিশ্বাস ও অস্বীকার করলেও কোন উপকার বা ক্ষতি হবে না। কেননা, সেটা কর্মজগত নয়-প্রতিদান দিবস। আল্লাহ্ তা'আলা এখনো চিন্তা-ভাবনা করার সুযোগ দিয়েছেন। এ সুযোগের সদ্ব্যবহার করে আল্লাহর নিদর্শনাবলীতে বিশ্বাস স্থাপন করলেই দুনিয়া ও আখেরাতে কল্যাণ সাধিত হবে। যদি তা না করে, তবে কিয়ামতের দিন আল্লাহ তা'আলা মিথ্যারোপকারীদের বলবেন, “এটাই সে আগুন যাকে তোমরা মিথ্যা মনে করতে [সূরা আত-তূর: ১৪]

কিয়ামতের দিন কাফেরদের সামনে কিভাবে এ সত্যকে উপস্থাপন করা হবে তার বর্ণনায় আল্লাহ আরও বলেন, “আর তারা দৃঢ়তার সাথে আল্লাহর শপথ করে বলে, যার মৃত্যু হয় আল্লাহ তাকে পুনর্জীবিত করবেন না। কেন নয়? তিনি তার প্রতিশ্রুতি পূর্ণ করবেনই। কিন্তু বেশীর ভাগ মানুষই এটা জানে না-- তিনি পুনরুথিত করবেন যে বিষয়ে তাদের মতানৈক্য ছিল তা তাদেরকে স্পষ্টভাবে দেখানোর জন্য এবং যাতে কাফিররা জানতে পারে যে, তারাই ছিল মিথ্যাবাদী। [সূরা আন-নাহ্‌ল: ৩৮, ৩৯] [সা’দী]

তাফসীরে জাকারিয়া

(৫) সত্য যখনই তাদের কাছে এসেছে, তারা তা মিথ্যাজ্ঞান করেছে। যা নিয়ে তারা ঠাট্টা-বিদ্রূপ করত, তার (পরিণাম) সংবাদ তারা অবহিত হবে। [1]

[1] অর্থাৎ, এই বিমুখতা এবং মিথ্যা ভাবার শাস্তি তারা পাবে। তখন তাদের মধ্যে এই অনুভূতির সৃষ্টি হবে যে, হায়! এই সত্য কিতাবকে মিথ্যাজ্ঞান এবং তার সাথে ঠাট্টা-বিদ্রূপ যদি না করতাম!

তাফসীরে আহসানুল বায়ান

শেয়ার লিঙ্ক কপি হয়েছে!

اَلَمۡ یَرَوۡا كَمۡ اَهۡلَكۡنَا مِنۡ قَبۡلِهِمۡ مِّنۡ قَرۡنٍ مَّكَّنّٰهُمۡ فِی الۡاَرۡضِ مَا لَمۡ نُمَكِّنۡ لَّكُمۡ وَ اَرۡسَلۡنَا السَّمَآءَ عَلَیۡهِمۡ مِّدۡرَارًا ۪ وَّ جَعَلۡنَا الۡاَنۡهٰرَ تَجۡرِیۡ مِنۡ تَحۡتِهِمۡ فَاَهۡلَكۡنٰهُمۡ بِذُنُوۡبِهِمۡ وَ اَنۡشَاۡنَا مِنۡۢ بَعۡدِهِمۡ قَرۡنًا اٰخَرِیۡنَ ﴾

তারা কি দেখে না, আমি তাদের পূর্বে বহু প্রজন্মকে ধ্বংস করেছি? যাদেরকে যমীনে এমনভাবে প্রতিষ্ঠিত করেছিলাম যেভাবে তোমাদেরকে প্রতিষ্ঠিত করিনি। আর তাদের উপর বৃষ্টি পাঠিয়েছিলাম মুষলধারে এবং সৃষ্টি করেছিলাম নদীসমূহ যা তাদের নীচে প্রবাহিত হত। অতঃপর তাদের পাপের কারণে তাদেরকে ধ্বংস করেছি এবং তাদের পরে অন্য প্রজন্মকে সৃষ্টি করেছি।

-আল-বায়ান

তারা কি লক্ষ্য করে না তাদের পূর্বে আমি কত জনগোষ্ঠীকে ধ্বংস করে দিয়েছি, তাদেরকে দুনিয়ায় (এমনভাবে) প্রতিষ্ঠিত করেছিলাম যে শক্তি-প্রতিষ্ঠা তোমাদেরকে দেয়া হয়নি, তাদের জন্য প্রচুর বৃষ্টিপাত ঘটিয়েছিলাম, তৈরি করেছিলাম নদী যা তাদের নিম্নদেশ দিয়ে প্রবাহিত হত, অতঃপর তাদের পাপের কারণে তাদেরকে ধ্বংস করে দিয়েছি আর তাদের পরে নতুন জনগোষ্ঠীর উত্থান ঘটালাম।

-তাইসিরুল

তারা কি ভেবে দেখেনি যে, আমি তাদের পূর্বে বহু দল ও সম্প্রদায়কে ধ্বংস করেছি, যাদেরকে দুনিয়ায় এমন শক্তি সামর্থ্য ও প্রতিপত্তি দিয়েছিলাম যা তোমাদেরকে দিইনি, আর আমি তাদের প্রতি আকাশ হতে প্রচুর বৃষ্টি বর্ষণ করেছি এবং তাদের নিম্নভূমি হতে ঝর্ণাধারা প্রবাহিত করেছি, কিন্তু আমার নি‘আমাতের শোকর না করার পাপের কারণে আমি তাদেরকে ধ্বংস করেছি, এবং তাদের পর অন্য নতুন নতুন জাতি ও সম্প্রদায়সমূহ সৃষ্টি করেছি।

-মুজিবুর রহমান

Have they not seen how many generations We destroyed before them which We had established upon the earth as We have not established you? And We sent [rain from] the sky upon them in showers and made rivers flow beneath them; then We destroyed them for their sins and brought forth after them a generation of others.

-Sahih International

৬. তারা কি দেখে না(১) যে, আমরা তাদের আগে বহু প্রজন্মকে(২) বিনাশ করেছি; তাদেরকে যমীনে এমনভাবে প্রতিষ্ঠিত করেছিলাম যেমনটি তোমাদেরকেও করিনি এবং তাদের উপর মুষলধারে বৃষ্টি বর্ষণ করেছিলাম। আর তাদের পাদদেশে নদী প্রবাহিত করেছিলাম; তারপর তাদের পাপের জন্য তাদেরকে বিনাশ করেছি(৩) এবং তাদের পর অন্য প্রজন্মকে সৃষ্টি করেছি।(৪)

(১) আলোচ্য প্রথম আয়াতে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর প্রত্যক্ষ সম্বোধিত মক্কাবাসীদের সম্পর্কে বলা হয়েছে যে, তারা কি পূর্ববর্তী জাতিসমূহের অবস্থা দেখেনি? দেখলে তা থেকে তারা শিক্ষা ও উপদেশ অর্জন করতে পারত। এখানে ‘দেখা’র অর্থ তাদের অবস্থা সম্পর্কে চিন্তা-ভাবনা করা। কেননা, সে জাতিগুলো তখন তাদের সামনে ছিল না। [আল-মানার]

(২) এ আয়াতে কাফেরদেরকে পূর্ববতী জাতিসমূহের ধ্বংস ও বিপর্যয় থেকে শিক্ষা নেয়ার কথা উল্লেখ করে বলা হয়েছে, “আমরা তাদের পূর্বে অনেক ‘করণ’ (প্রজন্ম)কে ধ্বংস করে দিয়েছি।” [সা’দী] قرن শব্দের অর্থ সমসাময়িক লোকসমাজ এবং সুদীর্ঘ কাল। দশ বছর থেকে একশ’ বছর পর্যন্ত সময়কাল অর্থেও এ শব্দটি ব্যবহৃত হয়। [বাগভী, কুরতুবী] কিন্তু قرن শব্দের অর্থ যে এক শতাব্দী, কোন কোন ঘটনা ও হাদীস থেকে এর সমর্থন পাওয়া যায়। এক হাদীসে আছে, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম আব্দুল্লাহ ইবনে বুছরকে বলেছিলেনঃ ‘সে এক করণ পর্যন্ত জীবিত থাকবে। পরে দেখা গেল যে, তিনি পূর্ণ একশ’ পর্যন্ত জীবিত ছিলেন’। [মুসনাদে আহমাদ ৪/১৮৯]

(৩) পূর্ববর্তী আয়াতসমূহে যারা আল্লাহর বিধান ও নবীগণের শিক্ষা থেকে মুখ ফিরিয়ে নিত কিংবা বিরোধিতা করত, তাদের প্রতি কঠোর শাস্তিবাণী উচ্চারিত হয়েছিল। আলোচ্য আয়াতসমূহে এসব অবিশ্বাসীর দৃষ্টি পারিপার্শ্বিক অবস্থা ও প্রাচীনকালের ঐতিহাসিক ঘটনাবলীর প্রতি আকৃষ্ট করে তাদেরকে শিক্ষা ও উপদেশ গ্রহণের সুযোগ দেয়া হয়েছে। [তাবারী, ইবন কাসীর] এ আয়াতে অতীত জাতিসমূহ সম্পর্কে বলা হয়েছে যে, আল্লাহ্ তা'আলা পৃথিবীতে তাদেরকে এমন বিস্তৃতি, শক্তি ও জীবন ধারণের সাজ-সরঞ্জাম দান করেছিলেন, যা পরবর্তী লোকদের ভাগ্যে জুটেনি।

কিন্তু তারাই যখন নবীগণের প্রতি মিথ্যারোপ করল এবং আল্লাহর নিদর্শনের বিরুদ্ধাচরণ করল, তখন প্রভূত জাকজমক, প্রতাপ-প্রতিপত্তি ও অর্থসম্পদ তাদেরকে আল্লাহর আযাব থেকে রক্ষা করতে পারল না। তারা পৃথিবীর বুক থেকে নিশ্চিহ্ন হয়ে গেছে। আজ মক্কাবাসীদেরকে সম্বোধন করা হচ্ছে। আদ ও সামূদ গোত্রের মত শক্তিবল তাদের নেই এবং সিরিয়া ও ইয়েমেনবাসীদের অনুরূপ স্বাচ্ছন্দ্যশীলও তারা নয়। এসব অতীত জাতিসমূহের ঘটনাবলী থেকে শিক্ষা গ্রহণ করা এবং নিজেদের ক্রিয়াকর্মের পর্যালোচনা করে দেখা তাদের উচিত। বিরুদ্ধাচরণ করলে তাদের পরিণতি কি হবে, তাও ভেবে দেখা দরকার। [ইবন কাসীর, আইসারুত তাফসীর, মুয়াসসার]

(৪) আয়াতের শেষে বলা হয়েছে, আল্লাহ তা'আলার শক্তি-সামর্থ্য শুধু প্রবল প্রতাপান্বিত, অসাধারণ জাকজমক ও সাম্রাজ্যের অধিপতি এবং জনবহুল ও মহাপরাক্রান্ত জাতিসমূহকে চোখের পলকে ধ্বংস করেই ক্ষান্ত হয়ে যায় নি, বরং তাদেরকে ধ্বংস করার সাথে সাথে তাদের স্থলে অন্য জাতি সৃষ্টি করে সেখানে বসিয়ে দিয়েছে। সুতরাং মক্কাবাসীদের উচিত ভয় করা। [কুরতুবী, ইবন কাসীর]

তাফসীরে জাকারিয়া

(৬) তারা কি দেখে না যে, তাদের পূর্বে কত মানবগোষ্ঠীকে আমি বিনাশ করেছি, যাদেরকে পৃথিবীতে এমনভাবে প্রতিষ্ঠিত করেছিলাম, যা তোমাদেরও করিনি এবং তাদের উপর মুষলধারে বৃষ্টি বর্ষণ করেছিলাম, আর তাদের পাদদেশে নদীমালা প্রবাহিত করেছিলাম। অতঃপর তাদের পাপের জন্য তাদেরকে বিনাশ করেছি[1] এবং তাদের পরে নূতন মানবগোষ্ঠী সৃষ্টি করেছি। [2]

[1] অর্থাৎ, তোমাদের পূর্বেকার অনেক জাতিকে যখন তাদের পাপের কারণে আমি ধ্বংস করে দিয়েছি, অথচ তাদের শক্তি-সামর্থ্য তোমাদের চেয়ে অনেক বেশী ছিল এবং সুখ-সমৃদ্ধি এবং জীবিকার উপায়-উপকরণাদির দিক দিয়েও তারা তোমাদের তুলনায় অনেক শ্রেষ্ঠ ছিল, তখন তোমাদেরকে ধ্বংস করা আমার জন্য কি কোন জটিল ব্যাপার? এ থেকে এ কথাও জানা গেল যে, কোন জাতির পার্থিব সম্পদের প্রাচুর্য এবং দুনিয়ার সুখ-সমৃদ্ধির আতিশয্য (জাগতিক প্রগতি) দেখে এটা যেন মনে করে না নেওয়া হয় যে, তারা বড়ই সফল। এটা তো অবকাশ দেওয়ার বহু প্রকারের এমন এক প্রকার, যা পরীক্ষা স্বরূপ আল্লাহ বিভিন্ন জাতিকে দিয়ে থাকেন। অতঃপর যখন অবকাশের সময়-কাল শেষ হয়ে যায়, তখন যাবতীয় পার্থিব সফলতা এবং সুখ-সমৃদ্ধি তাদেরকে আল্লাহর আযাব থেকে বাঁচাতে কোন কাজে আসে না।

[2] যাতে তাদেরকেও পূর্বের জাতিসমূহের ন্যায় পরীক্ষা করেন।

মন্তব্য করুন

ব্লগ