Loading..

ব্লগ

রিসেট

১৩ মার্চ, ২০২৬ ১০:০৬ অপরাহ্ণ

উজানী: গ্রামবাংলার হারিয়ে যাওয়া এক প্রাকৃতিক উৎসব মা মাছ বাঁচলে নদী-বিল বাঁচবে


উজানী: গ্রামবাংলার হারিয়ে যাওয়া এক প্রাকৃতিক উৎসব

মা মাছ বাঁচলে নদী-বিল বাঁচবে

বর্ষা এলে বাংলার প্রকৃতি যেন নতুন করে প্রাণ ফিরে পায়। আকাশে জমে কালো মেঘ, দূরে বাজ পড়ার শব্দ, আর তারপর হঠাৎ ঝমঝম করে নেমে আসে বৃষ্টি। শুকনো খাল-বিল, ডোবা আর নিচু জমি ভরে ওঠে পানিতে। মাঠে মাঠে জমে ওঠে ছোট ছোট জলাধার। এই সময়টাতেই শুরু হয় প্রকৃতির এক বিস্ময়কর ঘটনা—মাছের প্রজননের মৌসুম।

গভীর নদী, খাল বা বিলের জলে লুকিয়ে থাকা অনেক দেশি মাছ তখন যেন অদৃশ্য এক ডাকে সাড়া দেয়। তারা স্রোতের টানে বা প্রবল প্রবৃত্তিতে গভীর জলাশয় ছেড়ে অগভীর ঘাসে ভরা জমি, ডোবা কিংবা ধানক্ষেতের জলা জায়গায় উঠে আসে ডিম ছাড়ার জন্য। কক্সবাজার ও চট্টগ্রাম অঞ্চলের মানুষেরা এই ঘটনাকে একটি বিশেষ নামে ডাকে—“উজানী”

উজানী শুধু একটি প্রাকৃতিক ঘটনা নয়; এটি প্রকৃতির এক আনন্দময় উৎসব। বর্ষার প্রথম বৃষ্টিতে যখন পানির স্তর বাড়ে এবং ঘাস ও জলজ উদ্ভিদে ভরা অগভীর জমি তৈরি হয়, তখন মা মাছগুলো সেখানে নিরাপদ আশ্রয় খুঁজে পায়। নরম কাদা আর জলজ উদ্ভিদের ফাঁকে তারা ডিম ছাড়ে। এই পরিবেশে ডিম নিরাপদ থাকে এবং সেখানে প্রচুর ক্ষুদ্র খাদ্য উপাদান পাওয়া যায়, যা নবজাতক পোনার জন্য খুবই উপযোগী।

বাংলাদেশের অনেক পরিচিত দেশি মাছ—যেমন শিং, মাগুর, কই, টেংরা, পুঁটি, খলিশা, চাপিলা, মলা, ঢেলা—এই বর্ষাকালেই প্রজনন করে। একটি মা মাছ হাজার হাজার ডিম ছাড়তে পারে। কয়েক দিনের মধ্যেই সেই ডিম ফুটে বের হয় অসংখ্য ক্ষুদে পোনা মাছ। এই পোনাগুলো ধীরে ধীরে বড় হয়ে আবার নদী, খাল ও বিলকে মাছের প্রাচুর্যে ভরিয়ে তোলে। এক অর্থে বলা যায়, বর্ষার এই কয়েকটি দিনেই ভবিষ্যতের মাছের ভাণ্ডার তৈরি হয়।

কিন্তু এখানেই শুরু হয় বড় বিপদ।

এই গুরুত্বপূর্ণ সময়টাতেই কিছু অসাধু মানুষ লোভের বশে অগভীর পানিতে ওঠা ডিমওয়ালা মা মাছ ধরে ফেলে। কারণ তখন মাছগুলো সহজে ধরা যায়। জাল পেতে, খাঁচা বসিয়ে বা নানা ফাঁদ ব্যবহার করে তারা মা মাছ ধরে বাজারে বিক্রি করে। ফলে যে মাছগুলো হাজার হাজার ডিম দিয়ে ভবিষ্যতের মাছের ভাণ্ডার সমৃদ্ধ করার কথা ছিল, সেগুলোই অকালেই মানুষের পাতে চলে যায়।

একটু গভীরভাবে ভাবলে আমরা বুঝতে পারি—
এই মা মাছগুলো

প্রকৃতির নিয়মে  ডিম ছাড়ে বংশ রক্ষার জন্য, আর সেই প্রক্রিয়াই মানুষের খাদ্য ও পুষ্টির ভাণ্ডারকে সমৃদ্ধ করে।
সেই ডিম থেকে জন্ম নেয় অসংখ্য পোনা মাছ, যা ভবিষ্যতে আমাদের খাদ্য, পুষ্টি ও জীবিকার উৎস হয়ে ওঠে।

কিন্তু দুঃখজনকভাবে আমরা মানুষ অনেক সময় অতি লোভে সেই প্রাকৃতিক আশীর্বাদকে নষ্ট করে ফেলি। ডিম ছাড়ার আগেই মা মাছ ধরে আমরা শুধু একটি মাছ ধরি না—আমরা ভবিষ্যতের হাজার হাজার মাছের সম্ভাবনাকেও নষ্ট করি। এভাবে আমাদের নিজেদের হাতেই আমরা জাতীয় সম্পদের ক্ষতি ডেকে আনি।

আজ অনেক জায়গায় আমরা এই বাস্তবতা দেখতে পাচ্ছি। এক সময় গ্রামবাংলার খাল-বিল বা ধানক্ষেতে শিং, মাগুর, কই বা পুঁটি মাছ প্রচুর পাওয়া যেত। বর্ষার সময় গ্রামীণ মানুষ প্রায় হাত দিয়েই মাছ ধরতে পারত। এখন সেই দৃশ্য অনেক জায়গায় হারিয়ে গেছে। দেশি মাছ এখন অনেক ক্ষেত্রেই দুষ্প্রাপ্য এবং দামি হয়ে উঠেছে।

কিন্তু আশার কথা হলো, এই সমস্যার সমাধান খুব কঠিন নয়। বর্ষার শুরুতে যখন উজানী হয়, তখন মাত্র ৭ থেকে ১০ দিন যদি মা মাছ ধরা সম্পূর্ণ বন্ধ রাখা যায়, তাহলে অধিকাংশ মাছ নিরাপদে ডিম ছাড়তে পারবে। কয়েক দিনের মধ্যেই সেই ডিম থেকে জন্ম নেবে লক্ষ লক্ষ পোনা মাছ। অল্প কয়েক দিনের এই সংযমই ভবিষ্যতে আমাদের জলাশয়গুলোকে আবার মাছের অফুরন্ত ভাণ্ডারে পরিণত করতে পারে।

সরকার ইতিমধ্যে ইলিশ মাছ রক্ষার জন্য প্রজনন মৌসুমে নির্দিষ্ট সময় মাছ ধরা নিষিদ্ধ করেছে। যেমন ইলিশের প্রধান প্রজনন মৌসুমে ২২ দিনের নিষেধাজ্ঞা দেওয়া হয় এবং জাটকা রক্ষার জন্য নির্দিষ্ট সময় নদীতে মাছ ধরা বন্ধ রাখা হয়। এই উদ্যোগগুলো ইতিমধ্যে ভালো ফল দিয়েছে। একইভাবে দেশি মাছের ক্ষেত্রেও যদি উজানীর সময় কয়েক দিনের জন্য মাছ ধরা বন্ধ রাখা যায়, তাহলে মৎস্যসম্পদ অনেক বৃদ্ধি পেতে পারে।

তবে এই কাজটি শুধু সরকারি আইন দিয়ে সম্ভব নয়। এর জন্য দরকার সামাজিক সচেতনতা এবং মানুষের সহযোগিতা। জেলেদের বোঝাতে হবে—আজ যদি তারা কয়েকদিন মা মাছকে ডিম ছাড়তে দেয়, তাহলে আগামী বছর তারা আরও বেশি মাছ পাবে।

গ্রাম পর্যায়ে বিভিন্ন উদ্যোগ নেওয়া যেতে পারে। যেমন—

• উজানীর সময় প্রশাসনের বিশেষ তদারকি।

• মসজিদের মাইক, স্কুল ও সামাজিক সভার মাধ্যমে সচেতনতা প্রচার।

• স্থানীয়ভাবে “মা মাছ রক্ষা কমিটি” গঠন।

• বিষ প্রয়োগ, কারেন্ট জাল ও ক্ষতিকর মাছ ধরার পদ্ধতি বন্ধ করা।

আমাদের মনে রাখতে হবে, নদী-খাল-বিল শুধু পানির উৎস নয়; এগুলো জীববৈচিত্র্যের ভাণ্ডার। মাছ আমাদের দেশের মানুষের পুষ্টির অন্যতম প্রধান উৎস। তাই মৎস্যসম্পদ রক্ষা করা মানে দেশের খাদ্য নিরাপত্তা রক্ষা করা।

সুতরাং আজ আমাদের সবার একটি প্রতিজ্ঞা করা দরকার—উজানীর সময় মা মাছ ধরব না এবং অন্যদেরও ধরতে দেব না। মাত্র কয়েক দিনের এই সংযমই ভবিষ্যতে আমাদের নদী-বিলকে আবার প্রাণবন্ত করে তুলতে পারে।

কারণ সত্যটি খুব সহজ—
মা মাছ বাঁচলে নদী বাঁচবে, নদী বাঁচলে বাঁচবে আমাদের মৎস্যসম্পদ, পুষ্টি এবং গ্রামীণ জীবনের ঐতিহ্য।

আজ থেকেই প্রতিজ্ঞা করি: উজানীর সময় মা মাছ ধরব না। এই লেখাটি শেয়ার করুন, গ্রামের সবাইকে জানান। একসাথে মিলে গ্রামবাংলার এই হারানো উৎসবকে ফিরিয়ে আনি! 🐟🌧️🌿"
সমাপ্ত
মুফিদুল আলম
শিক্ষক ও পরিবেশবাদী
রামু,কক্সবাজার।

মন্তব্য করুন

ব্লগ