সহকারী শিক্ষক
১২ মার্চ, ২০২৬ ০৪:১৪ পূর্বাহ্ণ
মহান মুক্তিযুদ্ধে কাপাসিয়ার অবদান কলমে তৌফিক সুলতান
১৯৭১ সালের মহান মুক্তিযুদ্ধ বাঙালি জাতির ইতিহাসে এক অবিস্মরণীয় ও গৌরবময় অধ্যায়। দীর্ঘ নয় মাসের সশস্ত্র সংগ্রাম, লাখো শহীদের আত্মত্যাগ, অসংখ্য মা-বোনের সম্ভ্রমহানি এবং অগণিত মানুষের ত্যাগ-তিতিক্ষার মধ্য দিয়ে অর্জিত হয়েছে স্বাধীন সার্বভৌম বাংলাদেশ। পাকিস্তানি সামরিক শাসনের বিরুদ্ধে বাঙালি জাতির দীর্ঘ রাজনৈতিক সংগ্রাম, ভাষা আন্দোলন, ছয় দফা আন্দোলন, গণঅভ্যুত্থান এবং অবশেষে বঙ্গবন্ধুর ঐতিহাসিক ৭ই মার্চের ভাষণ—সবকিছু মিলেই স্বাধীনতার পথকে সুগম করে। এই মুক্তিযুদ্ধে বাংলাদেশের প্রতিটি অঞ্চল নিজ নিজ অবস্থান থেকে অংশগ্রহণ করে এবং একযোগে পাকিস্তানি দখলদার বাহিনীর বিরুদ্ধে প্রতিরোধ গড়ে তোলে। গাজীপুর জেলার কাপাসিয়া উপজেলা সেইসব গৌরবময় অঞ্চলের মধ্যে অন্যতম, যেখানে অসংখ্য বীর সন্তান মুক্তিযুদ্ধে সক্রিয় অংশগ্রহণ করে দেশমাতৃকার স্বাধীনতা অর্জনে অবদান রাখেন। কাপাসিয়ার ভূমিকা শুধু স্থানীয় প্রতিরোধের মধ্যেই সীমাবদ্ধ ছিল না; বরং জাতীয় পর্যায়ে নেতৃত্ব প্রদান, সংগঠন গড়ে তোলা, যুদ্ধ পরিচালনা এবং সাধারণ জনগণের ব্যাপক অংশগ্রহণের মাধ্যমে এটি মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাসে একটি গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায় হয়ে আছে।
কাপাসিয়ার ভৌগোলিক ও ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপট
গাজীপুর জেলার একটি ঐতিহাসিক ও গুরুত্বপূর্ণ উপজেলা হলো কাপাসিয়া। প্রাচীনকাল থেকেই এই অঞ্চল নদীবিধৌত উর্বর ভূমি হিসেবে পরিচিত। বানার নদী, পুরাতন ব্রহ্মপুত্র এবং শীতলক্ষ্যা নদীর অববাহিকায় অবস্থিত হওয়ায় এ অঞ্চলের যোগাযোগ ও অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডে নদীপথের গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা ছিল। প্রায় ৩৫৮ বর্গকিলোমিটার বিস্তৃত এই উপজেলা একসময় বৃহত্তর কাপাসিয়া থানা হিসেবে পরিচিত ছিল, যার অন্তর্ভুক্ত ছিল বর্তমান শ্রীপুর ও কালীগঞ্জ উপজেলার বিস্তীর্ণ এলাকা। রাজনৈতিক সচেতনতা ও স্বাধীনতার চেতনা এই অঞ্চলের মানুষের মধ্যে বহু আগে থেকেই বিদ্যমান ছিল। ১৯৫২ সালের ভাষা আন্দোলন, ১৯৫৪ সালের যুক্তফ্রন্ট নির্বাচন, ১৯৬৬ সালের ছয় দফা আন্দোলন এবং ১৯৬৯ সালের গণঅভ্যুত্থানে কাপাসিয়ার মানুষ সক্রিয়ভাবে অংশগ্রহণ করে। এসব আন্দোলনের ধারাবাহিকতায় এ অঞ্চলের তরুণ সমাজ পাকিস্তানি শাসনের অবসান ঘটিয়ে একটি স্বাধীন রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যে মানসিকভাবে প্রস্তুত হয়ে ওঠে।
জাতীয় নেতৃত্বে কাপাসিয়ার অবদান
মহান মুক্তিযুদ্ধে কাপাসিয়ার সর্বশ্রেষ্ঠ অবদান হচ্ছে বাংলাদেশের প্রথম প্রধানমন্ত্রী ও মুক্তিযুদ্ধের অন্যতম প্রধান সংগঠক বঙ্গতাজ তাজউদ্দীন আহমদের জন্ম এই মাটিতে। ১৯২৫ সালের ২৩ জুলাই কাপাসিয়ার দরদরিয়া গ্রামে তাঁর জন্ম। ছাত্রজীবন থেকেই তিনি রাজনীতিতে সক্রিয় ছিলেন এবং বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের ঘনিষ্ঠ সহচর হিসেবে আওয়ামী লীগের বিভিন্ন আন্দোলন-সংগ্রামে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেন। ১৯৭১ সালের ২৫ মার্চ পাকিস্তানি হানাদার বাহিনী অপারেশন সার্চলাইটের মাধ্যমে গণহত্যা শুরু করলে তাজউদ্দীন আহমদ সীমান্ত পেরিয়ে ভারতে যান এবং সেখানে গিয়ে স্বাধীনতা যুদ্ধ পরিচালনার জন্য আন্তর্জাতিক সমর্থন আদায়ে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেন। তাঁর নেতৃত্বে ১৯৭১ সালের ১৭ এপ্রিল মেহেরপুর জেলার বৈদ্যনাথতলায় মুজিবনগর সরকার গঠিত হয় এবং তিনি সেই সরকারের প্রধানমন্ত্রী হিসেবে মুক্তিযুদ্ধ পরিচালনার গুরুদায়িত্ব পালন করেন। তাঁর দূরদর্শী নেতৃত্ব, কূটনৈতিক দক্ষতা এবং সাংগঠনিক ক্ষমতা মুক্তিযুদ্ধকে একটি সুসংগঠিত রূপ দেয়। এজন্যই তিনি ইতিহাসে “বঙ্গতাজ” নামে অমর হয়ে আছেন।
মুক্তিযুদ্ধের প্রস্তুতি ও সংগঠন
বঙ্গবন্ধুর ৭ মার্চের ঐতিহাসিক ভাষণের পর কাপাসিয়ার সর্বস্তরের মানুষ স্বাধীনতার সংগ্রামে ঝাঁপিয়ে পড়ার জন্য প্রস্তুত হয়। উপজেলার বিভিন্ন শিক্ষা প্রতিষ্ঠান, হাট-বাজার ও গ্রামাঞ্চলে মিছিল, সভা-সমাবেশ এবং প্রচারণার মাধ্যমে মানুষকে মুক্তিযুদ্ধে অংশগ্রহণের জন্য উদ্বুদ্ধ করা হয়। মার্চ মাসের শেষদিকে কাপাসিয়ার তরুণ নেতারা গোপনে সংগঠিত হতে শুরু করেন। ছাত্রলীগের নেতা খালেদ খুররমের বাড়িতে কয়েকজন তরুণ শপথ গ্রহণ করেন যে তাঁরা দেশের স্বাধীনতার জন্য জীবন উৎসর্গ করতেও প্রস্তুত। এই ঘটনাকে কাপাসিয়ায় মুক্তিযুদ্ধের সংগঠিত সূচনা হিসেবে ধরা হয়। এরপর ধীরে ধীরে বিভিন্ন গ্রামে গোপন বৈঠক ও সংগঠন গড়ে তোলা হয় এবং তরুণদের প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা করা হয়।
অস্ত্র সংগ্রহ ও প্রতিরোধ গড়ে তোলা
মুক্তিযুদ্ধের প্রাথমিক পর্যায়ে মুক্তিযোদ্ধাদের জন্য অস্ত্র সংগ্রহ ছিল সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ। কাপাসিয়ার মুক্তিকামী তরুণরা অসীম সাহসিকতা ও কৌশলের মাধ্যমে এই সংকট মোকাবিলা করেন। জয়দেবপুরের সমরাস্ত্র কারখানার কর্মকর্তা-কর্মচারীরা পাকিস্তানি শাসনের বিরুদ্ধে অবস্থান নিয়ে কারখানা ত্যাগ করলে সেখান থেকে অস্ত্র সংগ্রহের সুযোগ সৃষ্টি হয়। মুক্তিযোদ্ধারা বিভিন্ন এলাকা থেকে রাইফেল, এলএমজি এবং বিপুল পরিমাণ গোলাবারুদ সংগ্রহ করেন। ১৯৭১ সালের ৩১ মার্চ কাপাসিয়া থানা আক্রমণের মাধ্যমে মুক্তিযোদ্ধারা আরও অস্ত্র সংগ্রহ করতে সক্ষম হন। এই অভিযানে ১৯টি .৩০৩ রাইফেলসহ বিপুল গোলাবারুদ উদ্ধার করা হয়। এসব অস্ত্র পরবর্তীকালে মুক্তিযোদ্ধাদের প্রশিক্ষণ ও যুদ্ধ পরিচালনায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে।
প্রশিক্ষণ কেন্দ্র ও সামরিক সংগঠন
মুক্তিযুদ্ধের সময় কাপাসিয়ার বিভিন্ন স্থানে অস্থায়ী প্রশিক্ষণ কেন্দ্র স্থাপন করা হয়। দিগধা মাদ্রাসা, পেচরদিয়া সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়, ঈদগাহ উচ্চ বিদ্যালয়, চরখামের প্রাথমিক বিদ্যালয়সহ বিভিন্ন স্থানে মুক্তিযোদ্ধাদের প্রশিক্ষণ দেওয়া হতো। এসব প্রশিক্ষণ কেন্দ্রে সাবেক সৈনিক ও পুলিশ সদস্যরা প্রশিক্ষকের দায়িত্ব পালন করেন। এপ্রিল মাসে প্রায় ৫০ জন মুক্তিযোদ্ধাকে উন্নত সামরিক প্রশিক্ষণের জন্য ভারতে পাঠানো হয়। আগরতলা ও অন্যান্য প্রশিক্ষণ ক্যাম্প থেকে প্রশিক্ষণ নিয়ে তারা দেশে ফিরে এসে পাকিস্তানি বাহিনীর বিরুদ্ধে সশস্ত্র যুদ্ধ শুরু করেন। কাপাসিয়ায় এফএফ, বিএলএফ ও নিয়মিত বাহিনীসহ বিভিন্ন সংগঠন সমন্বিতভাবে যুদ্ধ পরিচালনা করে।
উল্লেখযোগ্য যুদ্ধ ও বীরত্বগাথা
কাপাসিয়ায় মুক্তিযুদ্ধ চলাকালে বেশ কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ যুদ্ধ সংঘটিত হয়। এর মধ্যে কাপাসিয়া থানা আক্রমণ, গিলাপুরা টেকের যুদ্ধ, জামিরারচর ব্রিজ অপারেশন এবং তরগাঁও খেয়াঘাটের যুদ্ধ উল্লেখযোগ্য। বিশেষ করে ১৯৭১ সালের ১১ অক্টোবর তরগাঁও খেয়াঘাটে সংঘটিত যুদ্ধ ইতিহাসে স্মরণীয় হয়ে আছে। পাকিস্তানি সেনারা নদীপথে আক্রমণ করলে মুক্তিযোদ্ধারা কৌশলগত অবস্থান গ্রহণ করে প্রতিরোধ গড়ে তোলেন। এই যুদ্ধে মুক্তিযোদ্ধা সাজ্জাদ, গিয়াস ও আউয়াল বীরত্বের সঙ্গে যুদ্ধ করে শহীদ হন। তাদের আত্মত্যাগ কাপাসিয়ার মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাসে এক বেদনাবিধুর কিন্তু গৌরবময় স্মৃতি হিসেবে চিরস্মরণীয় হয়ে আছে।
সাধারণ মানুষের অবদান
মুক্তিযুদ্ধে শুধু মুক্তিযোদ্ধারাই নয়, কাপাসিয়ার সাধারণ মানুষও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেন। কৃষকরা খাদ্য সরবরাহ করেন, জেলে ও মাঝিরা নদীপথে মুক্তিযোদ্ধাদের নিরাপদে চলাচলে সহায়তা করেন, অনেক পরিবার নিজেদের ঘরে মুক্তিযোদ্ধাদের আশ্রয় দেন। নারীরাও চিকিৎসা সেবা, খাদ্য সরবরাহ এবং বিভিন্ন সহায়তার মাধ্যমে মুক্তিযুদ্ধে অংশগ্রহণ করেন। এই সর্বস্তরের মানুষের অংশগ্রহণই মুক্তিযুদ্ধকে গণযুদ্ধে পরিণত করে এবং পাকিস্তানি বাহিনীর বিরুদ্ধে প্রতিরোধকে শক্তিশালী করে।
স্মৃতি সংরক্ষণ ও মুক্তিযুদ্ধের নিদর্শন
স্বাধীনতার পর কাপাসিয়ায় মুক্তিযুদ্ধের স্মৃতি সংরক্ষণের জন্য বিভিন্ন উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। উপজেলা মুক্তিযোদ্ধা কমপ্লেক্স প্রাঙ্গণে নির্মিত হয়েছে “মুক্তির উল্লাস” নামক একটি ভাস্কর্য। এছাড়া তাজউদ্দীন চত্বরে বঙ্গবন্ধু ও তাজউদ্দীন আহমদের ম্যুরাল স্থাপন করা হয়েছে। বিভিন্ন রাস্তা ও স্থাপনার নামকরণ করা হয়েছে শহীদ মুক্তিযোদ্ধাদের নামে। তরগাঁওয়ে শহীদ সাজ্জাদ, গিয়াস ও আউয়ালের স্মৃতিতে স্মৃতিস্তম্ভ নির্মাণ করা হয়েছে। এসব স্থাপনা নতুন প্রজন্মকে মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস স্মরণ করিয়ে দেয়।
মহান মুক্তিযুদ্ধে কাপাসিয়ার অবদান বহুমাত্রিক ও গৌরবোজ্জ্বল। জাতীয় নেতৃত্বে বঙ্গতাজ তাজউদ্দীন আহমদের মতো ব্যক্তিত্বের আবির্ভাব যেমন এই অঞ্চলের গৌরব, তেমনি অসংখ্য তরুণ মুক্তিযোদ্ধার আত্মত্যাগও কাপাসিয়াকে ইতিহাসে অমর করে রেখেছে। শত শত মুক্তিযোদ্ধার অংশগ্রহণ, বহু শহীদের আত্মদান এবং সাধারণ মানুষের অকুণ্ঠ সমর্থনের মাধ্যমে কাপাসিয়া মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাসে এক উজ্জ্বল অধ্যায় রচনা করেছে। এই ইতিহাস শুধু অতীতের স্মৃতি নয়; এটি ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য দেশপ্রেম, সাহস ও আত্মত্যাগের অনুপ্রেরণা।
তথ্যসূত্র
১. বাংলাদেশ মুক্তিযুদ্ধ বিষয়ক মন্ত্রণালয়, মুক্তিযোদ্ধাদের সমন্বিত তালিকা।
২. গাজীপুর জেলা প্রশাসনের অফিসিয়াল ওয়েবসাইট।
৩. দৈনিক ইত্তেফাক, কাপাসিয়া বিষয়ক মুক্তিযুদ্ধের প্রতিবেদন।
৪. দৈনিক জনকণ্ঠ, মুক্তিযুদ্ধের যুদ্ধবৃত্তান্ত সংক্রান্ত প্রতিবেদন।
৫. সংগ্রামের নোটবুক: মুক্তিযুদ্ধে গাজীপুর জেলা।
৬. স্থানীয় মুক্তিযোদ্ধা ও প্রবীণ ব্যক্তিদের সাক্ষাৎকার।
৭. বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধ বিষয়ক বিভিন্ন গবেষণা গ্রন্থ ও প্রবন্ধ।
৮. কাপাসিয়া উপজেলা মুক্তিযোদ্ধা সংসদের দলিল ও নথিপত্র।
তৌফিক সুলতান,প্রভাষক - ব্রেভ জুবিলেন্ট স্কলার্স অফ মনোহরদী মডেল কলেজ,(বি জে এস এম মডেল কলেজ)মনোহরদী, নরসিংদী।
প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা - ওয়েল্ফশন মানবকল্যাণ সংঘ,কাপাসিয়া, গাজীপুর।
৫
৫ মন্তব্য