সহকারী শিক্ষক
১২ মার্চ, ২০২৬ ০৪:০০ পূর্বাহ্ণ
মহান মুক্তিযুদ্ধে কাপাসিয়ার অবদান
বাংলাদেশের স্বাধীনতার ইতিহাস রক্তে লেখা এক মহাকাব্য। ১৯৭১ সালের মহান মুক্তিযুদ্ধ ছিল বাঙালি জাতির অস্তিত্ব রক্ষার সংগ্রাম, আত্মমর্যাদার লড়াই এবং স্বাধীনতার জন্য এক অবিস্মরণীয় আত্মত্যাগের ইতিহাস। দীর্ঘ নয় মাসের যুদ্ধ, অগণিত শহীদের রক্ত এবং মুক্তিযোদ্ধাদের অদম্য সাহসিকতার মাধ্যমে পৃথিবীর মানচিত্রে জন্ম নেয় স্বাধীন সার্বভৌম বাংলাদেশ। এই মুক্তিযুদ্ধে দেশের প্রতিটি অঞ্চল নিজ নিজ অবস্থান থেকে অবদান রেখেছে। গাজীপুর জেলার কাপাসিয়া উপজেলা সেই গৌরবময় ইতিহাসের একটি উজ্জ্বল অধ্যায়। জাতীয় নেতৃত্ব, স্থানীয় সশস্ত্র প্রতিরোধ, মুক্তিযোদ্ধাদের বীরত্ব এবং সাধারণ মানুষের ত্যাগ—সব মিলিয়ে কাপাসিয়া মহান মুক্তিযুদ্ধে এক অনন্য অবদান রেখেছে।
কাপাসিয়া উপজেলা গাজীপুর জেলার একটি ঐতিহাসিক ও গুরুত্বপূর্ণ এলাকা। প্রায় ৩৫৮ বর্গকিলোমিটার আয়তনের এই অঞ্চল বানার নদী, পুরাতন ব্রহ্মপুত্র ও শীতলক্ষ্যা নদী দ্বারা পরিবেষ্টিত। প্রাকৃতিক সৌন্দর্যে ভরপুর এই অঞ্চলটি ইতিহাস ও ঐতিহ্যের জন্যও সমৃদ্ধ। একসময় কাপাসিয়া, শ্রীপুর ও কালীগঞ্জ একত্রে কাপাসিয়া থানা হিসেবে পরিচিত ছিল। মুক্তিযুদ্ধের সময় এই অঞ্চলের মানুষ স্বাধীনতার আহ্বানে সাড়া দিয়ে সংগঠিত হয়ে পাকিস্তানি হানাদার বাহিনীর বিরুদ্ধে প্রতিরোধ গড়ে তোলে। সরকারিভাবে জানা যায়, কাপাসিয়া উপজেলায় ৮৩৫ জনেরও বেশি মুক্তিযোদ্ধা সরাসরি যুদ্ধে অংশগ্রহণ করেছিলেন। তাদের মধ্যে একজন বীর বিক্রম এবং দুইজন বীর প্রতীক খেতাবপ্রাপ্ত মুক্তিযোদ্ধা রয়েছেন। এছাড়া এই উপজেলার অন্তত ২০ জন মুক্তিযোদ্ধা শহীদ হন।
মহান মুক্তিযুদ্ধে কাপাসিয়ার অবদান বিশেষভাবে দুটি দিক থেকে উল্লেখযোগ্য—জাতীয় পর্যায়ে নেতৃত্ব প্রদান এবং স্থানীয় পর্যায়ে সশস্ত্র প্রতিরোধ গড়ে তোলা।
জাতীয় নেতৃত্বের ক্ষেত্রে কাপাসিয়ার অবদান অত্যন্ত গৌরবময়। এই উপজেলার দরদরিয়া গ্রামে ১৯২৫ সালের ২৩ জুলাই জন্মগ্রহণ করেন বাংলাদেশের মহান মুক্তিযুদ্ধের অন্যতম স্থপতি শহীদ তাজউদ্দীন আহমদ। তিনি ছিলেন আওয়ামী লীগের অন্যতম প্রতিষ্ঠাতা সদস্য এবং ১৯৬৬ সালে দলের সাধারণ সম্পাদক নির্বাচিত হন। ১৯৭০ সালের সাধারণ নির্বাচনে আওয়ামী লীগের নিরঙ্কুশ বিজয়ের পর পাকিস্তানি সামরিক শাসকগোষ্ঠী ক্ষমতা হস্তান্তরে টালবাহানা শুরু করলে দেশের রাজনৈতিক পরিস্থিতি ক্রমশ উত্তপ্ত হয়ে ওঠে। অবশেষে ১৯৭১ সালের ২৫ মার্চ রাতে পাকিস্তানি সেনাবাহিনী “অপারেশন সার্চলাইট” নামে বর্বর গণহত্যা শুরু করে।
এই ভয়াবহ পরিস্থিতিতে তাজউদ্দীন আহমদ অত্যন্ত সাহসিকতা ও দূরদর্শিতার পরিচয় দেন। তিনি ভারতে গিয়ে আন্তর্জাতিক সমর্থন অর্জনের উদ্যোগ নেন এবং স্বাধীনতা সংগ্রামকে সুসংগঠিত করার লক্ষ্যে গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ গ্রহণ করেন। ১৯৭১ সালের ১৭ এপ্রিল মেহেরপুরের বৈদ্যনাথতলায় অস্থায়ী বাংলাদেশ সরকার গঠিত হয়, যা ইতিহাসে মুজিবনগর সরকার নামে পরিচিত। বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানকে রাষ্ট্রপতি ঘোষণা করে তাজউদ্দীন আহমদ প্রধানমন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব গ্রহণ করেন। তাঁর বিচক্ষণ নেতৃত্বে মুক্তিবাহিনী সংগঠিত হয়, বিভিন্ন সেক্টরে যুদ্ধ পরিচালনার পরিকল্পনা গ্রহণ করা হয় এবং আন্তর্জাতিক অঙ্গনে বাংলাদেশের স্বাধীনতার পক্ষে জনমত গড়ে তোলা সম্ভব হয়। তাঁর দক্ষ নেতৃত্ব ও অদম্য সাহসিকতার ফলেই মুক্তিযুদ্ধ একটি সুসংগঠিত জাতীয় সংগ্রামে রূপ লাভ করে এবং অবশেষে ১৯৭১ সালের ১৬ ডিসেম্বর বাংলাদেশ বিজয় অর্জন করে। তাজউদ্দীন আহমদের জন্মস্থান হিসেবে কাপাসিয়া এই গৌরবময় ইতিহাসের সাথে অবিচ্ছেদ্যভাবে যুক্ত।
জাতীয় নেতৃত্বের পাশাপাশি স্থানীয় পর্যায়েও কাপাসিয়ার মুক্তিযোদ্ধারা অসাধারণ সাহসিকতা প্রদর্শন করেন। ১৯৭১ সালের ৭ মার্চ বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের ঐতিহাসিক ভাষণের পর কাপাসিয়ার ছাত্র-যুবকরা স্বাধীনতার জন্য সংগঠিত হতে শুরু করেন। ছাত্রলীগ নেতা মাহমুদুল আলম খান (বেনু)-এর নেতৃত্বে মুক্তিবাহিনী গঠন করা হয়। স্বাধীনতার জন্য জীবন উৎসর্গ করার শপথ নিয়ে তরুণরা অস্ত্র সংগ্রহ ও প্রশিক্ষণের কাজে আত্মনিয়োগ করেন।
১৯৭১ সালের ২৯ মার্চ জয়দেবপুরের নিকটবর্তী মাত্রাগ্রাম এলাকা থেকে ৩০ বাক্স চাইনিজ রাইফেলের গুলি উদ্ধার করে কাপাসিয়ায় গোপনে সংরক্ষণ করা হয়। এরপর ৩১ মার্চ মুক্তিযোদ্ধারা সাহসিকতার সঙ্গে কাপাসিয়া থানা আক্রমণ করেন। মাহমুদুল আলম খান (বেনু), মুহম্মদ শহীদুল্লাহ এবং আনোয়ার হোসেনের নেতৃত্বে পরিচালিত এই অভিযানে মুক্তিযোদ্ধারা ১৯টি .৩০৩ রাইফেল, বিপুল গোলাবারুদ এবং বেয়নেট দখল করতে সক্ষম হন। এই অস্ত্রগুলো পরবর্তীতে মুক্তিযোদ্ধাদের প্রশিক্ষণ ও যুদ্ধে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে।
মুক্তিযোদ্ধাদের প্রশিক্ষণের জন্য কাপাসিয়ার বিভিন্ন স্থানে ক্যাম্প স্থাপন করা হয়। দিগধা মাদ্রাসা, রায়নন্দার টেক, হরিমঞ্জুরী উচ্চ বিদ্যালয়, পেচরদিয়া প্রাথমিক বিদ্যালয়, ঈদগাহ উচ্চ বিদ্যালয়, চরখামের প্রাথমিক বিদ্যালয়, দিগধা সিনিয়র মাদ্রাসা এবং কপালেশ্বর উচ্চ বিদ্যালয় ছিল উল্লেখযোগ্য প্রশিক্ষণ কেন্দ্র। এই প্রশিক্ষণ কার্যক্রম পরিচালনায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেন মুজাহিদ জালাল উদ্দিন এবং পুলিশ সদস্য মমতাজ উদ্দিন। এপ্রিল মাসে প্রায় ৫০ জন মুক্তিযোদ্ধাকে ভারতে পাঠিয়ে উন্নত সামরিক প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা করা হয়। পরবর্তীতে আরও কিছু মুক্তিযোদ্ধাকে আগরতলায় পাঠিয়ে বিশেষ কমান্ডো প্রশিক্ষণ দেওয়া হয়।
মুক্তিযুদ্ধের সময় কাপাসিয়ায় একাধিক গুরুত্বপূর্ণ যুদ্ধ সংঘটিত হয়। এর মধ্যে উল্লেখযোগ্য হলো কাপাসিয়া থানা আক্রমণ, গিলাপুরা টেকের যুদ্ধ, জামিরারচর ব্রিজ অপারেশন, তরগাঁও লঞ্চঘাটের যুদ্ধ এবং তরগাঁও খেয়াঘাটের যুদ্ধ। এসব যুদ্ধে মুক্তিযোদ্ধারা অসীম সাহসিকতার সঙ্গে পাকিস্তানি বাহিনীর বিরুদ্ধে প্রতিরোধ গড়ে তোলেন।
বিশেষভাবে স্মরণীয় ১৯৭১ সালের ১১ অক্টোবরের যুদ্ধ। সে সময় পাকিস্তানি সেনারা নদীপথে আক্রমণের পরিকল্পনা করলে মুক্তিযোদ্ধারা কৌশলগত অবস্থান গ্রহণ করেন। সংঘর্ষে মুক্তিযোদ্ধা সাজ্জাদ, গিয়াস এবং আউয়াল বীরত্বের সাথে যুদ্ধ করে শহীদ হন। তাদের আত্মত্যাগ কাপাসিয়ার মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাসে এক অবিস্মরণীয় অধ্যায় হিসেবে চিরকাল স্মরণীয় হয়ে থাকবে।
মুক্তিযুদ্ধের সময় কাপাসিয়ার সাধারণ জনগণও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেন। গ্রামের কৃষক, জেলে, মাঝি, ছাত্র ও সাধারণ মানুষ মুক্তিযোদ্ধাদের আশ্রয়, খাদ্য ও তথ্য দিয়ে সহযোগিতা করেন। অনেক পরিবার নিজেদের জীবনের ঝুঁকি নিয়ে মুক্তিযোদ্ধাদের লুকিয়ে রাখতেন এবং পাকিস্তানি বাহিনীর গতিবিধি সম্পর্কে তথ্য সরবরাহ করতেন। জনগণের এই অকৃত্রিম সমর্থন মুক্তিযুদ্ধকে শক্তিশালী করে তোলে।
মুক্তিযুদ্ধে বীরত্বপূর্ণ অবদানের স্বীকৃতি হিসেবে কাপাসিয়ার কয়েকজন মুক্তিযোদ্ধা রাষ্ট্রীয় খেতাব লাভ করেন। মো. দৌলত হোসেন মোল্লা বীর বিক্রম খেতাবে ভূষিত হন। এছাড়া আব্দুল বাতেন খান এবং ফারুক লস্কর বীর প্রতীক খেতাব লাভ করেন। তাদের বীরত্বগাথা আজও নতুন প্রজন্মকে দেশপ্রেমের শিক্ষা দেয়।
স্বাধীনতার পর কাপাসিয়ায় মুক্তিযুদ্ধের স্মৃতি সংরক্ষণের জন্য বিভিন্ন উদ্যোগ গ্রহণ করা হয়েছে। শহীদদের স্মরণে স্মৃতিস্তম্ভ নির্মাণ করা হয়েছে এবং অনেক রাস্তা ও স্থাপনার নামকরণ করা হয়েছে বীর মুক্তিযোদ্ধাদের নামে। শহীদ তাজউদ্দীন আহমদের স্মরণে কাপাসিয়ায় স্মৃতিভাস্কর্য নির্মাণ করা হয়েছে, যা মুক্তিযুদ্ধের গৌরবময় ইতিহাসের স্মারক হিসেবে দাঁড়িয়ে আছে।
মহান মুক্তিযুদ্ধে কাপাসিয়া শুধু একটি ভৌগোলিক অঞ্চল হিসেবে নয়, বরং বীরত্ব, ত্যাগ এবং দেশপ্রেমের প্রতীক হিসেবে ইতিহাসে স্থান করে নিয়েছে। জাতীয় নেতা শহীদ তাজউদ্দীন আহমদের দূরদর্শী নেতৃত্ব, স্থানীয় মুক্তিযোদ্ধাদের সাহসিকতা এবং সাধারণ মানুষের অকৃত্রিম সমর্থন মিলেই কাপাসিয়া মহান মুক্তিযুদ্ধে এক গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছে। এই অঞ্চলের শহীদদের রক্তে রঞ্জিত মাটি আজও স্বাধীনতার গৌরবগাথা বহন করে। ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য এই ইতিহাস দেশপ্রেম, সাহস এবং আত্মত্যাগের অনন্ত প্রেরণা হয়ে থাকবে।
তৌফিক সুলতান,প্রভাষক - ব্রেভ জুবিলেন্ট স্কলার্স অফ মনোহরদী মডেল কলেজ,(বি জে এস এম মডেল কলেজ)মনোহরদী, নরসিংদী।
প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা - ওয়েল্ফশন মানবকল্যাণ সংঘ,কাপাসিয়া, গাজীপুর।
১
১ মন্তব্য