সহকারী শিক্ষক
০৬ মার্চ, ২০২৬ ১১:০৮ পূর্বাহ্ণ
নজরুল কি সত্যিই অসাম্প্রদায়িক ছিলেন ?
নজরুল বাস্তবে কতখানি অসাম্প্রদায়িক চেতনার মানুষ ছিলেন তা জানতে গেলে আমাদের নজরুলের ব্যক্তিজীবন ও কর্মজীবন উভয়ই চর্চা করা আবশ্যক। ১৮৯৯ সালে জন্ম নেওয়া নজরুলের শিক্ষাজীবন শুরু হয় মক্তবে। সেখানে তিনি ইসলাম ধর্মীয় শিক্ষা গ্রহণের পর মসজিদের মুয়াজ্জিন ও মাজারের খাদেম হিসাবে তার কর্মজীবন শুরু করেছিলেন। সুতরাং ইসলামিক জ্ঞান তিনি বাল্যকালেই প্রাপ্ত করেন। পরে লোকগান ও নাট্যদলের প্রভাবে তিনি সাংস্কৃতিক জগতের প্রতি অনুরাগী হন। কবি হিসাবে মোটামুটি খ্যাতি লাভের পর নজরুল বঙ্গীয় মুসলিম সাহিত্য সমিতির সদস্য হন। উল্লেখ্য, এই সমিতির প্রতিষ্ঠাতা ছিলেন কম্যুনিস্ট নেতা মুজাফফর আহমেদ এবং এর প্রথম সম্পাদক ছিলেন ড. মুহাম্মদ শহীদুল্লাহ। কলকাতার ৩২ নং কলেজ স্ট্রিটে প্রতিষ্ঠিত এই মুসলিম সাহিত্য সমিতি থেকে বঙ্গীয় মুসলিম সাহিত্য সমিতি পত্রিকা নামক একটি পত্রিকা বের হত যেখানে কেবল মুসলিম সাহিত্যিকদের লেখা ছাপানো হত। তখন বঙ্গীয় মুসলিম সাহিত্য পরিষদ নামে একটি সংগঠন ছিল যেখানে হিন্দু-মুসলমান নির্বিশেষে সাহিত্য চর্চা হত কিন্তু অকারণেই শহীদুল্লাহ, মুজাফফরের মত মুসলিম সাহিত্যিক ও রাজনীতিকরা সেই সংগঠন থেকে বেরিয়ে এসে কেবল মুসলমানদের জন্য আলাদা সাহিত্য সমিতি গঠন করেন। কাজী নজরুল ইসলামও সেই নির্দিষ্ট সম্প্রদায়ের জন্য গঠিত সমিতির সঙ্গেই যুক্ত হন। তিনি যে তৎকালীন ইসলামপন্থী কবি সাহিত্যিকদের সংস্পর্শেই থাকতেন এটা তার একটি প্রমাণ। বঙ্গীয় মুসলিম সাহিত্য সমিতির আলী আকবর খানের সঙ্গে নজরুলের ভাল বন্ধুত্ব হয়। আলী আকবর খান তার ভাগ্নি নার্গিস আসার খানমের সঙ্গে নজরুলের বিয়ে দেন। কিন্তু বিয়ের পর শর্ত জুড়ে দেন তাকে ঘরজামাই থাকতে হবে। নজরুল তাতে আপত্তি জানিয়ে নার্গিসকে তালাক দিয়ে কুমিল্লায় চলে যায়। সেখানে পূর্ব পরিচিত বিধবা গিরিবালা দেবীর বাড়িতে গিয়ে অসুস্থ হয়ে পড়লে গিরিবালা ও তার মেয়ে প্রমীলা দেবীর শুশ্রূষায় নজরুল সুস্থ হয়ে ওঠে। তখন নজরুল ও প্রমীলার মধ্যে প্রণয়ের সম্পর্ক গড়ে ওঠে, অবশ্য এর আগে থেকেই তাদের মধ্যে পরিচয় ছিল। গিরিবালা দেবীরও নজরুলকে নিজের ছেলের মত ভালবাসতেন। গিরিবালা বিধবা হলেও তিনি তেমন ধর্মকর্ম মানতেন না ও স্বাধীনচেতা আধুনিক মনস্ক ছিলেন, তাই সুদর্শন মেধাবী তথাপি বেকার নজরুলের সঙ্গে মেয়ের বিয়ের দিতে তিনি দুবার ভাবেননি। বর কনে বা অভিভাবক রাজি থাকলেও সমাজ তো আর হিন্দু-মুসলমান বিয়েতে সহজে সাই দেবে না। নজরুল ছিলেন অনাথ তাই উভয় পক্ষের অভিভাবক গিরিবালা দেবী নিজেই। গিরিবালা দেবী ছিলেন ত্রিপুরার নায়েব বসন্তকুমার সেনগুপ্তের দ্বিতীয় স্ত্রী। বিধবা হলেও তার নামে যথেষ্ট সম্পদ ছিল। গিরিবালার আত্মীয়স্বজন এই বিয়েতে রাজী না থাকা সত্ত্বেও গিরিবালা সমাজকে তোয়াক্কা না করে মেয়ের বিয়ে দেন কেবল নজরুলের প্রতি তার মাতৃস্নেহের কারণে। বিয়ের সময় নজরুলের বয়স ছিল পঁচিশ ও প্রমিলা দেবীর বয়স ছিল মাত্র ষোল বছর। সেইসময়ে অর্থাৎ ১৯২৪ সালেও স্ব স্ব ধর্মে থেকে বিয়ে করার আইন প্রচলিত ছিল, যাকে সিভিল ম্যারেজ এ্যাক্ট ১৮৭২ এর ৩ বলা হত। কিন্তু নজরুল ও প্রমীলা দেবীর বিয়ে হয়েছিল মুসলিম রীতিতেই এবং বিয়ের পর প্রমীলা দেবীর নাম হয় প্রমিলা নজরুল ইসলাম। নজরুল প্রমীলা দম্পতির চার সন্তানের নাম রাখা হয় যথাক্রমে কাজী কৃষ্ণ মুহাম্মদ, অরিন্দম খালেদ (বুলবুল), কাজী সব্যসাচী এবং কাজী অনিরুদ্ধ। এমন নামকরণের কারণে অনেকেই মনে করেন নজরুল পুত্ররা হিন্দু বা নাস্তিক কিন্তু বাস্তবে এদের সবাই ইসলাম ধর্মেরই অনুসারী। নজরুল পুত্রদের বাল্যকালে খতনা দেওয়া হয়নি বলেও অনেকে বলে থাকেন নজরুলের পুত্ররা হিন্দু। কিন্তু সত্য হল, নজরুল খতনায় বিশ্বাস করতেন না কারণ খতনা প্রথাটি এসেছে ইহুদিদের থেকে। মুসলিমরা ইহুদিদের এই প্রথাটি অনুসরণ করে মাত্র কিন্তু খতনা না করালে সে মুসলমান হবে না ইসলামে এমনটা বলা নেই। নজরুলেন বন্ধু সুফী জুলফিকার হায়দার ছেলেদের খতনা করানোর জন্য ভীষণ পীড়াপীড়ি করতেন কিন্তু নজরুলের যুক্তি ছিল তিনি ইহুদিদের প্রথা মানবেন না। নামগুলো লক্ষ্য করলে বুঝতে পারবেন, ধর্মীয় বা বংশীয় কাজী পদবী সব ছেলের নামের শুরুতেই রয়েছে, শুধু নামগুলো আরবীর জায়গায় বাংলায় রেখেছিলেন নজরুল। তাই যারা মনে করেন নজরুল ও তার পরিবার কোনো ধর্ম মানতো না তারা নজরুলের বর্তমান বংশধরদের খোঁজ খবর নিয়ে দেখতে পারেন। নজরুলের পুত্র কাজী সব্যসাচীর মেয়ে খিলখিল কাজী একজন সংগীত শিল্পী এবং তিনি ঢাকায় বসবাস করেন, খিলখিল কাজী নামটা শুনে নিশ্চয় আর কোনো ভুল বোঝাবুঝির অবকাশ থাকার কথা নয়।
নজরুলের লেখা শ্যামাসংগীত নিয়ে যতটা চর্চা হয় হিন্দুসমাজে, নজরুলের লেখা গজল, হামদ ও নাত কিংবা নজরুলের ইসলামী কবিতা নিয়ে তেমন কোনো আলোচনা চোখে পড়ে না। যদিও শ্যামা সংগীতের চেয়ে তার ইসলামী সংগীত ও কবিতার সংখ্যা অনেক অনেক বেশি। নজরুল তিন হাজারেরও বেশি গান লিখেছেন ও সুর করেছেন যা রবীন্দ্রসংগীতের তুলনায় প্রায় দ্বিগুণ। এর মধ্যে শ্যামাসংগীত কয়টিই বা লিখেছেন? নজরুল যেমন সাম্যের কবিতা
৫
৫ মন্তব্য