Loading..

ব্লগ

রিসেট

০৪ মার্চ, ২০২৬ ১২:৫৭ পূর্বাহ্ণ

বাংলাদেশের মাধ্যমিক শিক্ষায় শিখন-শেখানো কৌশল: ধারণা, গুরুত্ব ও প্রয়োগ

ভূমিকা

শিক্ষা ব্যবস্থার প্রাণকেন্দ্র হলো শ্রেণিকক্ষ, আর এই শ্রেণিকক্ষের সফলতা নির্ভর করে শিখন-শেখানো কৌশলের ওপর। শিখন-শেখানো কৌশল বলতে কেবলমাত্র পাঠদান পদ্ধতিকে বোঝায় না, বরং এটি একটি বৃহৎ পরিকল্পনা যা শিক্ষকের দৃষ্টিভঙ্গি, শ্রেণিকক্ষ ব্যবস্থাপনা, শিক্ষার্থীর চাহিদা বিশ্লেষণ এবং নির্দিষ্ট শিখনফল অর্জনের সামগ্রিক কাঠামোকে নির্দেশ করে। বাংলাদেশের মাধ্যমিক শিক্ষা বর্তমানে একটি পরিবর্তনশীল ধারা অতিক্রম করছে, যেখানে মুখস্থনির্ভর শিক্ষার পরিবর্তে সৃজনশীল ও দক্ষতাভিত্তিক শিক্ষার ওপর জোর দেওয়া হচ্ছে। এই লক্ষ্য পূরণের জন্য শিখন-শেখানো কৌশল ও এর সঠিক প্রয়োগ অপরিহার্য -1

শিখন-শেখানো কৌশল ও পদ্ধতির মধ্যে পার্থক্য

প্রায়ই আমরা শিখন কৌশল (Learning Strategy) এবং শেখানো পদ্ধতি (Teaching Method) শব্দ দুটিকে একই অর্থে ব্যবহার করি, যদিও এদের মধ্যে সূক্ষ্ম কিন্তু গুরুত্বপূর্ণ পার্থক্য রয়েছে

শেখানো পদ্ধতি হলো সেই সব নির্দিষ্ট কার্যক্রম বা কার্যপ্রণালী যা একজন শিক্ষক তার শিক্ষার্থীদের শেখানোর জন্য শ্রেণিকক্ষে প্রয়োগ করেন। যেমন: বক্তৃতা দেওয়া, আলোচনা, দলগত কাজ, প্রদর্শন ইত্যাদি। অন্যদিকে, শিখন-শেখানো কৌশল হলো একটি সামগ্রিক পরিকল্পনা বা কাঠামো। এটি নির্ধারণ করে কোন লক্ষ্য অর্জনের জন্য কোন পদ্ধতিগুলো, কী ক্রমে এবং কীভাবে ব্যবহার করা হবে। যেমন, একটি বিষয় শেখানোর জন্য শিক্ষক সিদ্ধান্ত নিতে পারেন যে তিনি প্রথমে একটি ভিডিও ক্লিপ দেখাবেন (পদ্ধতি), তারপর দলগত আলোচনা করাবেন (পদ্ধতি)। এই পুরো পরিকল্পনাটি হলো তার কৌশলসহজ ভাষায়, কৌশল হলো "কী করব" তার পরিকল্পনা, আর পদ্ধতি হলো "কীভাবে করব" তার বাস্তবায়ন -1

বাংলাদেশের মাধ্যমিক শিক্ষার বর্তমান প্রেক্ষাপট

বাংলাদেশের মাধ্যমিক স্তর (ষষ্ঠ থেকে দশম শ্রেণি) হলো শিক্ষার্থীদের জন্য একটি গুরুত্বপূর্ণ ক্রান্তিকাল। এই বয়সে তাদের মানসিক ও বুদ্ধিবৃত্তিক বিকাশ ত্বরান্বিত হয়। জাতীয় শিক্ষানীতি-২০১০ এবং সাম্প্রতিক শিক্ষাক্রম রূপরেখা-২০২১-এ শিক্ষার্থীদের যোগ্যতা ও দক্ষতাভিত্তিক শিক্ষার ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। তবে বাস্তব চিত্র এখনও কিছুটা ভিন্ন। অধিকাংশ বিদ্যালয়, বিশেষ করে গ্রামীণ এলাকায়, এখনও প্রচলিত "মুখস্থনির্ভর" ও "শিক্ষককেন্দ্রিক" পদ্ধতিই অনুসৃত হয়। এখানে শিখন-শেখানো কৌশল হিসেবে সক্রিয় অংশগ্রহণমূলক পদ্ধতির প্রয়োগ সীমিত। কিন্তু বর্তমান শিক্ষাক্রম শিক্ষার্থীদের সমস্যা সমাধানের দক্ষতা, বিশ্লেষণধর্মী চিন্তা ও সৃজনশীলতা বিকাশের ওপর জোর দেওয়ায় আধুনিক শিখন কৌশল গ্রহণের প্রয়োজনীয়তা দিন দিন বৃদ্ধি পাচ্ছে

প্রধান শিখন-শেখানো কৌশল ও তাদের প্রয়োগ

বাংলাদেশের মাধ্যমিক শ্রেণিকক্ষে নিম্নলিখিত শিখন-শেখানো কৌশলগুলি কার্যকরভাবে কাজে লাগানো যেতে পারে:

১. সহযোগিতামূলক ও দলগত শিক্ষণ কৌশল (Collaborative Learning)

এই কৌশলে শিক্ষার্থীরা ছোট ছোট দলে কাজ করে। এটি একটি শিক্ষণ পদ্ধতি হতে পারে, তবে যখন শিক্ষক লক্ষ্য স্থির করেন যে, "আজকের পাঠ শেষে শিক্ষার্থীরা দলগতভাবে একটি সমস্যার সমাধান করতে পারবে", তখন এটি একটি কৌশলে পরিণত হয় -1

  • প্রয়োগ: বাংলাদেশের মাধ্যমিক শ্রেণিতে বাংলাদেশের ইতিহাসের কোনো গুরুত্বপূর্ণ ঘটনা বা পদার্থবিজ্ঞানের কোনো প্রকল্প নিয়ে দলগত কাজ দেওয়া যেতে পারে। এতে শিক্ষার্থীরা নিজেদের মধ্যে মতবিনিময় করে, তথ্য বিশ্লেষণ করে এবং একে অপরের কাছ থেকে শেখার সুযোগ পায়

২. ছদ্মশিক্ষণ বা সিমুলেশন কৌশল (Simulation)

ছদ্মশিক্ষণ হলো বাস্তব জীবনের পরিস্থিতির একটি সরলীকৃত বা কৃত্রিম মডেল তৈরি করে শেখানোর কৌশল। এটি শিক্ষার্থীদের বাস্তব অভিজ্ঞতা দিতে সাহায্য করে -2

  • প্রয়োগ: মাধ্যমিক শ্রেণিতে পৌরনীতি বা নাগরিকতা বিষয়ে "সংসদীয় বিতর্ক" বা "আদালতের কার্যক্রম" এর ছদ্মরূপ দেওয়া যেতে পারে। শিক্ষার্থীরা সাংসদ, বিচারক, উকিল ইত্যাদির ভূমিকা পালন করবে। এতে তারা বিষয়বস্তু সম্পর্কে গভীর ধারণা লাভ করে এবং তাদের আচরণিক পরিবর্তন ও সিদ্ধান্ত গ্রহণের দক্ষতা বৃদ্ধি পায় -2বাংলা সাহিত্যের কোনো নাটকের অংশ বিশেষ অভিনয় করে দেখানোও ছদ্মশিক্ষণের অংশ

৩. অনুশিক্ষণ কৌশল (Micro-teaching)

যদিও অনুশিক্ষণ মূলত শিক্ষক প্রশিক্ষণের একটি কৌশল, এর নীতিগুলো শিক্ষার্থীদের শেখানোর ক্ষেত্রেও প্রয়োগ করা যায় -2এটি একটি জটিল দক্ষতাকে ক্ষুদ্র অংশে ভেঙে বারবার চর্চার মাধ্যমে আয়ত্ত করার পদ্ধতি

  • প্রয়োগ: গণিতের কোনো জটিল সূত্র বা ইংরেজি ব্যাকরণের কোনো নিয়ম শিক্ষার্থীদের বোঝানোর জন্য শিক্ষক প্রথমে একটি অংশ খুব সহজভাবে উপস্থাপন করবেন, তারপর শিক্ষার্থীদের বারবার চর্চার সুযোগ দেবেন এবং সাথে সাথে তাদের ভুল সংশোধন করে দেবেন

৪. আবিষ্কারমূলক শিক্ষণ কৌশল (Inquiry-Based Learning)

এই কৌশলে শিক্ষক সরাসরি জ্ঞান দেন না, বরং শিক্ষার্থীদের সামনে সমস্যা উপস্থাপন করেন এবং তাদেরকে অনুসন্ধানের মাধ্যমে সমাধান বের করতে উৎসাহিত করেন

  • প্রয়োগ: পরিবেশ বিজ্ঞান ক্লাসে শিক্ষক স্থানীয় একটি নদীর দূষণের কারণ শিক্ষার্থীদের নিজ উদ্যোগে খুঁজে বের করার কাজ দিতে পারেন। শিক্ষার্থীরা তথ্য সংগ্রহ, বিশ্লেষণ এবং উপস্থাপনের মাধ্যমে শিখবে

৫. সমন্বিত শিক্ষণ কৌশল (Integrated Teaching)

এটি এমন একটি কৌশল যেখানে একটি বিষয়ের সঙ্গে অন্য বিষয়ের সংযোগ স্থাপন করে শেখানো হয়

  • প্রয়োগ: বাংলা সাহিত্যের কবিতার সঙ্গে ইতিহাসের কোনো ঘটনা বা সমাজবিজ্ঞানের বিষয়ের সম্পর্ক স্থাপন করে পাঠ দিলে শিক্ষার্থীরা বিষয়টি সার্বিক দৃষ্টিকোণ থেকে দেখতে পাবে এবং শিখন স্থায়ী হবে

বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে কৌশল প্রয়োগের চ্যালেঞ্জ ও সম্ভাবনা

বাংলাদেশের মাধ্যমিক শিক্ষায় এসব শিখন-শেখানো কৌশল কাজে লাগাতে গেলে কিছু চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা করতে হবে:
১. শিক্ষকের ভূমিকা: শিক্ষকদের শুধু "পাঠদাতা" না থেকে "সহায়ক" বা "ফ্যাসিলিটেটর" এর ভূমিকা নিতে হবে। এজন্য প্রয়োজন মানসম্পত প্রশিক্ষণ।
২. শ্রেণিকক্ষের আকার: অধিকাংশ বিদ্যালয়ে শ্রেণিকক্ষ শিক্ষার্থীতে ঠাসা, যা সহযোগিতামূলক বা আবিষ্কারমূলক কৌশল প্রয়োগে বাধা সৃষ্টি করে -2
৩. অবকাঠামোগত সীমাবদ্ধতা: ছদ্মশিক্ষণের মতো কৌশলের জন্য অডিও-ভিজুয়াল সামগ্রী প্রয়োজন, যা অনেক বিদ্যালয়ে নেই -2
৪. মূল্যায়ন পদ্ধতি: বর্তমান মূল্যায়ন পদ্ধতি এখনও মুখস্থবিদ্যাকে প্রাধান্য দেয়। যতক্ষণ পর্যন্ত মূল্যায়ন ব্যবস্থায় সৃজনশীলতা ও দক্ষতার সঠিক মূল্যায়ন না হবে, ততক্ষণ শিক্ষক ও শিক্ষার্থীরা আধুনিক কৌশল গ্রহণে অনীহা দেখাবে

উপসংহার

শিখন-শেখানো কৌশল শিক্ষার গুণগত মানোন্নয়নের মূল চাবিকাঠি। বাংলাদেশের মাধ্যমিক শিক্ষাকে বিশ্বমানের করে গড়ে তুলতে হলে পুরনো মুখস্থনির্ভর পদ্ধতির বাইরে এসে আধুনিক ও অংশগ্রহণমূলক কৌশল গ্রহণ করতে হবে। ছদ্মশিক্ষণ, অনুশিক্ষণ, সহযোগিতামূলক শিক্ষণ প্রভৃতি কৌশল শিক্ষার্থীদের মধ্যে সৃজনশীলতা, সমালোচনামূলক চিন্তন এবং ব্যবহারিক দক্ষতা বিকাশে অপরিহার্য। সরকার, শিক্ষক ও অভিভাবকদের সম্মিলিত প্রচেষ্টায় বিদ্যমান চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা করে এই কৌশলগুলোর সঠিক প্রয়োগ নিশ্চিত করা সম্ভব। তবেই আমরা একটি সুশিক্ষিত ও দক্ষ মানবসম্পদ গড়ে তুলতে সক্ষম হব, যা বাংলাদেশের টেকসই উন্নয়নের ভিত্তি স্থাপন করবে

মন্তব্য করুন

ব্লগ