সহকারী শিক্ষক
০১ মার্চ, ২০২৬ ০৫:০৫ পূর্বাহ্ণ
নিকোলা টেসলা: কেন তাকে “Lost Genius” বলা হয়?
বিজ্ঞান ইতিহাসে এমন কিছু নাম আছে, যাদের জীবন যেন একসাথে আলো আর অন্ধকারের গল্প। Nikola Tesla তাদের মধ্যে সবচেয়ে রহস্যময়। আজকের বিদ্যুৎ ব্যবস্থা, রেডিও প্রযুক্তি, ওয়্যারলেস শক্তি—এসবের পেছনে তার অবদান থাকলেও, জীবদ্দশায় তিনি ছিলেন প্রায় অবহেলিত। মৃত্যুর পর তাকে বলা হয়েছে “ভবিষ্যতের মানুষ”, “ভুল সময়ে জন্ম নেওয়া প্রতিভা”, আর সবচেয়ে বেশি—“Lost Genius”।
এই প্রতিবেদন সেই প্রশ্নের উত্তর খুঁজবে: কেন টেসলা হারিয়ে গেলেন? ইতিহাস কি তাকে ইচ্ছাকৃতভাবে আড়াল করেছে, নাকি তিনি নিজেই নিজেকে ধ্বংস করেছিলেন?
জন্ম এক অস্থির সময়ে
১৮৫৬ সালে অস্ট্রো-হাঙ্গেরীয় সাম্রাজ্যের অন্তর্গত স্মিলজান অঞ্চলে জন্ম নেওয়া টেসলা (বর্তমান Croatia) ছোটবেলা থেকেই অসাধারণ স্মৃতিশক্তি ও কল্পনাশক্তির অধিকারী ছিলেন। তিনি দাবি করতেন, কোনো যন্ত্র বানানোর আগে সেটি পুরোপুরি মাথার ভেতর ডিজাইন করে ফেলতে পারতেন—প্রায় নিখুঁতভাবে।
ইউরোপে পড়াশোনা শেষে তিনি পাড়ি জমান যুক্তরাষ্ট্রে, স্বপ্ন ছিল বিদ্যুতের জগতে বিপ্লব ঘটানোর।
এডিসনের সঙ্গে সংঘর্ষ: ‘কারেন্ট যুদ্ধ’
যুক্তরাষ্ট্রে এসে তিনি কাজ শুরু করেন Thomas Edison–এর প্রতিষ্ঠানে। কিন্তু খুব দ্রুতই মতবিরোধ দেখা দেয়। এডিসন সরাসরি প্রবাহ (DC) ব্যবস্থাকে সমর্থন করতেন, আর টেসলা বিশ্বাস করতেন পরিবর্তী প্রবাহ (AC) ভবিষ্যতের বিদ্যুৎ ব্যবস্থা।
এই দ্বন্দ্ব ইতিহাসে পরিচিত “War of Currents” নামে।
টেসলার ধারণাকে সমর্থন দেন শিল্পপতি George Westinghouse। শেষ পর্যন্ত AC সিস্টেমই জয়ী হয় এবং আজ পুরো বিশ্ব সেই ব্যবস্থাতেই চলছে। অথচ দীর্ঘদিন ধরে জনমানসে এডিসনই ছিলেন বিদ্যুতের নায়ক, টেসলা নয়।
এখান থেকেই “হারিয়ে যাওয়া প্রতিভা”র গল্প শুরু।
ভবিষ্যৎ দেখার অদ্ভুত ক্ষমতা
টেসলা ১৮৯০–এর দশকেই ওয়্যারলেস যোগাযোগ, রিমোট কন্ট্রোল, এমনকি স্মার্টফোনের মতো ধারণা নিয়ে কথা বলেছিলেন। ১৮৯৮ সালে তিনি রেডিও-নিয়ন্ত্রিত নৌকার প্রদর্শনী করেন—যা অনেকেই বিশ্বাসই করতে পারেননি।
১৯০১ সালে তিনি নিউ ইয়র্কের লং আইল্যান্ডে নির্মাণ শুরু করেন Wardenclyffe Tower—একটি বিশাল টাওয়ার, যার লক্ষ্য ছিল তারবিহীন বিদ্যুৎ ও তথ্য প্রেরণ।
কিন্তু অর্থের অভাবে প্রকল্পটি বন্ধ হয়ে যায়। বিনিয়োগকারীরা দ্রুত লাভ চেয়েছিলেন, আর টেসলার স্বপ্ন ছিল মানবজাতির জন্য “ফ্রি এনার্জি”।
স্বপ্ন বনাম পুঁজির লড়াইয়ে স্বপ্ন হেরে যায়।
কলোরাডো স্প্রিংসের বজ্রপাত
১৮৯৯ সালে Colorado Springs–এ টেসলা উচ্চ-ভোল্টেজ পরীক্ষায় নামেন। সেখানে তিনি কৃত্রিম বজ্রপাত সৃষ্টি করেন এবং পৃথিবীর মাধ্যমে শক্তি পরিবহনের ধারণা পরীক্ষা করেন।
স্থানীয় সংবাদপত্রে তাকে কখনো “পাগল বিজ্ঞানী”, কখনো “জাদুকর” বলা হতো। তার পরীক্ষাগুলো এতটাই নাটকীয় ছিল যে অনেকেই ভাবতেন, তিনি সীমা ছাড়িয়ে যাচ্ছেন।
বিতর্ক, দাবি এবং বাস্তবতা
টেসলা দাবি করেছিলেন “ডেথ রে” অস্ত্র তৈরির কথা—যা দিয়ে যুদ্ধ বন্ধ করা সম্ভব হবে। অনেক পত্রিকা এই দাবি ছাপায়, কিন্তু কোনো বাস্তব প্রমাণ মেলে না।
১৯৪৩ সালে নিউ ইয়র্কে তার মৃত্যুর পর মার্কিন সরকার তার কাগজপত্র জব্দ করে। এই কাজটি করে Federal Bureau of Investigation। ফলে ষড়যন্ত্র তত্ত্ব জন্ম নেয়—সরকার কি তার আবিষ্কার গোপন করেছে?
পরে কিছু নথি প্রকাশ পেলেও, রহস্য পুরোপুরি কাটেনি।
একাকীত্ব, অবহেলা, এবং পতন
জীবনের শেষভাগে টেসলা প্রায় নিঃস্ব। তিনি নিউ ইয়র্কের একটি হোটেল কক্ষে একা থাকতেন। পায়রা পোষতেন, মানুষের চেয়ে তাদের সঙ্গেই বেশি সময় কাটাতেন।
১৯৪৩ সালের ৭ জানুয়ারি New York City–এ তিনি মৃত্যুবরণ করেন। তখন তার বয়স ৮৬।
মৃত্যুর সময় তার ব্যাংক অ্যাকাউন্টে প্রায় কিছুই ছিল না।
কেন “Lost Genius”?
১. স্বীকৃতির অভাব
এডিসন ছিলেন ব্যবসায়ী ও প্রচারক—টেসলা ছিলেন স্বপ্নদ্রষ্টা। ইতিহাস প্রায়ই বাজারমুখী মানুষকে বেশি মনে রাখে।
২. অর্থনৈতিক ব্যর্থতা
বড় বড় প্রকল্প অর্থের অভাবে থেমে যায়। বিনিয়োগকারীরা তাকে “অবাস্তব কল্পনাবিলাসী” ভাবতে শুরু করেন।
৩. অগ্রগামী চিন্তা
তার অনেক ধারণা সময়ের চেয়ে অনেক এগিয়ে ছিল। মানুষ বুঝতে পারেনি, তাই গুরুত্ব দেয়নি।
৪. রহস্য ও মিথ
সরকারি নথি জব্দ হওয়া, “ডেথ রে”–র মতো দাবি—এসব তাকে রহস্যময় করে তোলে, কিন্তু বৈজ্ঞানিকভাবে দুর্বল অবস্থানে ফেলে।
মৃত্যুর পর পুনর্জন্ম
১৯৬০ সালে আন্তর্জাতিক একক পদ্ধতিতে চৌম্বকীয় ফ্লাক্স ঘনত্বের একক হিসেবে “Tesla” নামকরণ করা হয়—তার সম্মানে।
আজ সার্বিয়া এবং যুক্তরাষ্ট্রে তার মূর্তি দাঁড়িয়ে আছে। সাবেক Yugoslavia অঞ্চলে তাকে জাতীয় নায়ক ধরা হয়।
২১শ শতকে সোশ্যাল মিডিয়া ও ডকুমেন্টারি তাকে আবার জনপ্রিয় করে তুলেছে। অনেকেই তাকে আধুনিক প্রযুক্তির আদি স্থপতি হিসেবে দেখেন।
শেষ কথা
নিকোলা টেসলা কি সত্যিই “হারিয়ে যাওয়া প্রতিভা”?
হয়তো তিনি হারাননি—বরং সময় তাকে ধরতে পারেনি।
তার জীবন আমাদের শেখায়:
প্রতিভা থাকলেই যথেষ্ট নয়, প্রয়োজন কৌশল, পৃষ্ঠপোষকতা এবং সঠিক সময়।
আজ যখন আমরা বিদ্যুতের সুইচ অন করি, হয়তো অজান্তেই টেসলার স্বপ্নের আলোই জ্বলে ওঠে।
৫
৫ মন্তব্য