প্রধান শিক্ষক
২৮ ফেব্রুয়ারি, ২০২৬ ০৫:২৮ পূর্বাহ্ণ
তাহাজ্জুদ নামাযের ফযিলত......
---
তাহাজ্জুদ নামায: কুরআনের আলোকে ফযীলত ও গুরুত্ব
ভূমিকা
রাতের নিস্তব্ধতা, যখন গোটা বিশ্ব ঘুমের ঘোরে আচ্ছন্ন, তখনই বান্দার জন্য opens a special door of mercy. এই সময়টাতেই আল্লাহ তাআলা তাঁর বান্দাদের সবচেয়ে কাছে পেয়ে যান। ইসলামী পরিভাষায় রাতের এই নফল ইবাদতকে "তাহাজ্জুদ" বা "কিয়ামুল লায়ল" বলা হয় । এটি একটি অত্যন্ত ফযীলতপূর্ণ ইবাদত, যা বান্দাকে তার সৃষ্টিকর্তার আরও নিকটবর্তী করে দেয়। পবিত্র কুরআনে বহু স্থানে এ নামাযের গুরুত্ব ও ফযীলত বর্ণিত হয়েছে। এই ব্লগে আমরা কুরআনের আয়াতের আলোকে তাহাজ্জুদ নামাযের ফযীলতগুলো তুলে ধরার চেষ্টা করব।
পরিচিতি: তাহাজ্জুদ কী?
'তাহাজ্জুদ' শব্দটি আরবী 'হাজ্জাদা' থেকে উদ্ভূত, যার অর্থ রাতে জেগে থাকা বা ঘুম থেকে উঠে নামায পড়া । সাধারণত এশার নামাযের পর থেকে ফজরের আজান পর্যন্ত সময়টুকুতে যে নফল নামায পড়া হয়, তাকে তাহাজ্জুদ বা কিয়ামুল লায়ল বলা হয়। তবে সর্বোত্তম সময় হলো রাতের শেষ তৃতীয়াংশ । এটি কোনো ফরজ ইবাদত নয়, বরং একটি নফল ইবাদত, যা রাসূলুল্লাহ (সা.)-এর সুন্নত এবং সৎকর্মশীল বান্দাদের বৈশিষ্ট্য ।
কুরআনের আয়াতে তাহাজ্জুদের ফযীলত
পবিত্র কুরআনের অসংখ্য আয়াতে আল্লাহ তাআলা তাহাজ্জুদ নামায পড়ুদের প্রশংসা করেছেন এবং তাদের জন্য অসাধারণ পুরস্কারের ঘোষণা দিয়েছেন।
১. মাকামে মাহমুদ (প্রশংসিত স্থান) প্রাপ্তি:
আল্লাহ তাআলা সূরা বনী ইসরাইলে তাঁর প্রিয় নবী (সা.)-কে উদ্দেশ্য করে বলেন:
"وَمِنَ الَّيْلِ فَتَهَجَّدْ بِهٖ نَافِلَةً لَّكَ ۖ عَسٰٓى اَنْ يَّبْعَثَكَ رَبُّكَ مَقَامًا مَّحْمُوْدًا"
"আর রাত্রির কিছু অংশে তাহাজ্জুদ পড়তে থাকুন; এটি আপনার জন্য এক অতিরিক্ত কর্তব্য। শীঘ্রই আপনার প্রতিপালক আপনাকে 'মাকামে মাহমুদে' (প্রশংসিত স্থানে) পৌঁছাবেন।" (সূরা বনী ইসরাইল: ৭৯)
এই আয়াতে তাহাজ্জুদ পড়াকে 'নাফেলাহ' বা অতিরিক্ত ইবাদত হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে, যা বোঝায় এটি কোনো বোঝা নয়, বরং আল্লাহর পক্ষ থেকে বিশেষ অনুগ্রহ লাভের একটি সুযোগ । এই নামাযের প্রতিদান হিসেবে আল্লাহ তায়ালা তাঁর রাসূলকে দুনিয়া ও আখিরাতে একটি প্রশংসিত মর্যাদা দেওয়ার প্রতিশ্রুতি দেন, যা মুমিনদের জন্যও এই ইবাদতের উচ্চ মর্যাদার ইঙ্গিত বহন করে।
২. নেককার ও মুত্তাকীদের বৈশিষ্ট্য:
যারা রাতের অন্ধকারে শয্যা ত্যাগ করে আল্লাহর দরবারে দাঁড়ান, কুরআনে তাদেরকে নেককার ও মুত্তাকী হিসেবে আখ্যায়িত করা হয়েছে। সূরা যারিয়াতে ইরশাদ হয়েছে:
"اِنَّ الْمُتَّقِيْنَ فِيْ جَنّٰتٍ وَّعُيُوْنٍۙ اٰخِذِيْنَ مَآ اٰتٰىهُمْ رَبُّهُمْ ۗ اِنَّهُمْ كَانُوْا قَبْلَ ذٰلِكَ مُحْسِنِيْنَ ۚ كَانُوْا قَلِيْلًا مِّنَ الَّيْلِ مَا يَهْجَعُوْنَ وَبِالْاَسْحَارِ هُمْ يَسْتَغْفِرُوْنَ"
"নিশ্চয়ই মুত্তাকীরা থাকবে জান্নাতে ও প্রস্রবণসমূহে। তাদের প্রতিপালক তাদের যা দেবেন, তাঁরা তা গ্রহণ করবেন। নিশ্চয় তারা ইতিপূর্বে ছিল সৎকর্মপরায়ণ। তারা রাত্রির সামান্য অংশই নিদ্রায় কাটাতো। এবং রাতের শেষ প্রহরে তারা ক্ষমা প্রার্থনা করত।" (সূরা যারিয়াত: ১৫-১৮)
এই আয়াত স্পষ্ট করে যে, জান্নাত লাভ ও আল্লাহর সন্তুষ্টি অর্জনের পথ হলো রাতের বেলা ইবাদতে কাটানো এবং শেষ রাতে ক্ষমা প্রার্থনা করা।
৩. শরীর ও মনকে নিয়ন্ত্রণের শ্রেষ্ঠ মাধ্যম:
রাতের বেলা নামায পড়ার একটি বিশেষ গুণ হলো এটি মানুষের অন্তরে আল্লাহর ভয় ও ভালোবাসা সৃষ্টি করে এবং আত্মাকে সংযত করে। সূরা মুযযাম্মিলে আল্লাহ বলেন:
"اِنَّ نَاشِئَةَ الَّيْلِ هِيَ اَشَدُّ وَطْـًٔا وَّاَقْوَمُ قِيْلًا"
"নিশ্চয় রাত্রিতে জাগরণ প্রবৃত্তি দলনে সহায়ক এবং বাক্য স্পষ্টতর হয়।" (সূরা মুযযাম্মিল: ৭৩:৬)
অন্য আয়াতে আরও বলা হয়েছে:
"تَتَجَافٰى جُنُوْبُهُمْ عَنِ الْمَضَاجِعِ يَدْعُوْنَ رَبَّهُمْ خَوْفًا وَّطَمَعًا وَّمِمَّا رَزَقْنٰهُمْ يُنْفِقُوْنَ ۚ فَلَا تَعْلَمُ نَفْسٌ مَّآ اُخْفِيَ لَهُمْ مِّنْ قُرَّةِ اَعْيُنٍ جَزَاءًۢ بِمَا كَانُوْا يَعْمَلُوْنَ"
"তাদের পার্শ্ব শয্যা থেকে আলাদা থাকে; তারা তাদের প্রতিপালককে ডাকে ভয়ে ও আশায়। আর আমি তাদেরকে যে রিযক দিয়েছি, তা থেকে তারা ব্যয় করে। এখন কেউ জানে না, তাদের জন্যে কি চক্ষু শীতলকারী বস্তু লুক্কায়িত আছে, তাদের কর্মের প্রতিদানস্বরূপ।" (সূরা আস-সাজদাহ: ৩২:১৬-১৭)
এ আয়াতে আল্লাহ তায়ালা ঘোষণা দিচ্ছেন যে, যারা রাতের বেলা তাঁর ইবাদত করে, তাদের জন্য কী অফুরন্ত পুরস্কার রাখা হয়েছে, তা কারো কল্পনার বাইরে ।
৪. জ্ঞানী ও অজ্ঞের মধ্যে পার্থক্য:
আল্লাহ তায়ালা তাহাজ্জুদ নামায পড়ুয়াদের মর্যাদা এতটাই উঁচু করেছেন যে, তিনি তাদেরকে জ্ঞানী হিসেবে চিহ্নিত করেছেন। সূরা যুমারে ইরশাদ হয়েছে:
"اَمَّنْ هُوَ قَانِتٌ اٰنَا۬ءَ الَّيْلِ سَاجِدًا وَّقَا۬ئِمًا يَّحْذَرُ الْاٰخِرَةَ وَيَرْجُوْا رَحْمَةَ رَبِّهٖ ۗ قُلْ هَلْ يَسْتَوِى الَّذِيْنَ يَعْلَمُوْنَ وَالَّذِيْنَ لَا يَعْلَمُوْنَ ۗ اِنَّمَا يَتَذَكَّرُ اُولُوا الْاَلْبَابِ"
"যে ব্যক্তি রাতের প্রহরে সেজদাবনত ও দণ্ডায়মান হয়ে ইবাদত করে, আখিরাতকে ভয় করে এবং তার প্রতিপালকের রহমত প্রত্যাশা করে, সে কি তার সমান, যে করে না? বলুন, 'যারা জানে এবং যারা জানে না, তারা কি সমান হতে পারে?' চিন্তা-ভাবনা কেবল তারাই করে, যারা বুদ্ধিমান।" (সূরা যুমার: ৩৯:৯)
৫. আল্লাহর বিশেষ বান্দার পরিচয়:
সূরা ফুরকানে আল্লাহ তাআলা 'ইবাদুর রহমান' (দয়াময়ের বান্দা) বা মুমিনদের যেসব গুণাবলি বর্ণনা করেছেন, তার মধ্যে তাহাজ্জুদ অন্যতম:
"وَالَّذِيْنَ يَبِيْتُوْنَ لِرَبِّهِمْ سُجَّدًا وَّقِيَامًا"
"এবং যারা তাদের প্রতিপালকের উদ্দেশ্যে সিজদাবনত হয়ে ও দণ্ডায়মান হয়ে রাত্রিযাপন করে।" (সূরা আল-ফুরকান: ২৫:৬৪)
তাহাজ্জুদ নামাযের অনন্য কিছু দিক
কুরআনের আয়াতগুলো থেকে আমরা বুঝতে পারি, তাহাজ্জুদ নামায শুধু একটি নফল ইবাদত নয়, বরং এটি একটি আধ্যাত্মিক প্রশিক্ষণ। এটি বান্দাকে আত্মশুদ্ধি, ধৈর্য ও আল্লাহর প্রতি অগাধ ভালোবাসা শেখায়। বিখ্যাত তাফসীর 'পাঁচ খণ্ড ভাষ্য'-এ উল্লেখ করা হয়েছে যে, মানুষের আধ্যাত্মিক বিকাশের জন্য রাতের নামাযের চেয়ে বেশি ফলপ্রসূ আর কিছুই নেই। যে ব্যক্তি আত্মশৃঙ্খলা অর্জন করতে ও কার্যকরী চরিত্র গঠন করতে চায়, তার জন্য তাহাজ্জুদের অভ্যাস অপরিহার্য ।
কীভাবে তাহাজ্জুদের অভ্যাস গড়ে তোলা যায়?
এই মহান ফযীলত লাভের জন্য প্রয়োজন দৃঢ় সংকল্প। রাসূলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, রাতে ঘুমাতে যাওয়ার সময় যদি কেউ তাহাজ্জুদ পড়ার দৃঢ় ইচ্ছা করে এবং ঘুমের কারণে উঠতে না পারে, তাহলেও সে তার ইচ্ছার বিনিময় পাবে । এছাড়া:
· পরিবারকে উৎসাহিত করা: রাসূল (সা.) পরিবারের সদস্যদের জাগিয়ে তাহাজ্জুদ পড়তে উৎসাহিত করতেন ।
· শয়তানের প্রতিরোধ: ঘুমের সময় শয়তান আমাদের মাথার পেছনে তিনটি গিট দেয়, কিন্তু আল্লাহর স্মরণ ও ওযুর মাধ্যমে এই গিট খুলে যায় এবং আমরা সতেজ হয়ে উঠি ।
উপসংহার
পবিত্র কুরআনের আয়াতসমূহ তাহাজ্জুদ নামাযের ফযীলত সম্পর্কে কোনো সন্দেহ রাখে না। এটি মুমিনের জন্য রহমত, মাগফিরাত এবং উচ্চ মর্যাদা লাভের একটি অনন্য সোপান। আল্লাহ তাআলার নৈকট্য লাভের শ্রেষ্ঠ মাধ্যম এই নামায । তাই আসুন, আমরা সবাই রাতের শেষ প্রহরে শয্যা ত্যাগ করার অভ্যাস গড়ে তুলি এবং আমাদের প্রভুর দরবারে কান্নাকাটি করে দুনিয়া ও আখিরাতের সফলতা কামনা করি।
৫
৫ মন্তব্য