Loading..

ব্লগ

রিসেট

২৭ ফেব্রুয়ারি, ২০২৬ ১০:৪৪ অপরাহ্ণ

মাজেদুল হকের কবিতায় বিরহের আধিপত্য


মাজেদুল হকের কবিতায় বিরহের আধিপত্য 



মাজেদুল হক (জন্ম- ৩ জুলাই ১৯৭৭খ্রিস্টাব্দ)
পূর্ণ নাম - শেখ মোহাম্মদ মাজেদুল হক ওরফে মাজেদ, সাহিত্যাঙ্গণে সুপরিচিত নাম - মাজেদুল হক  " বিরহী কবি " উপাধিতে ভূষিত।  


কাব্যজগতে মাজেদুল হক নিজস্ব স্বাধীন স্বত্তার অধিকারী ছান্দসিক কবি। কবিতা কে নিজের মতো করে সংজ্ঞায়িত করতে গিয়ে "কবিতা" শিরোনামে 
তিনি লিখেছেন -

কবিতা, 
ক- বি- তা-  ;
কবি বিবেক তাপস, 
জীবন প্রেম যশ। 

কবি,
ক - বি-  ;
কথা বিশ্লেষক, 
শব্দের অন্বেষক।

বিবেক,
বি- বে- ক-  ;
বিষয় বেষ্টিত করণ, 
বাক্যে ছন্দের প্রকরণ। 

তাপস, 
তা- প- স-  ;
তালাস পণ্ডিত সঞ্চয়, 
বিচিত্র জ্ঞানের সমন্বয়। 

কিশোর বয়সে যখন কবির জীবনে প্রেম আসে তখন কবি মাজেদুল হক লিখেছেন -

" প্রেম "

শুনেছি লোকের মুখে 
প্রেম করে সাধু, 
মনের প্রকৃত আকর্ষণ 
নয় কোন যাদু। 

জেনেছি জ্ঞানীর কাছে 
খাঁটি প্রেম করিলে, 
সুখের অমৃত স্বাদ 
প্রেমিকের ভাগ্যে মিলে। 

দেখেছি জগতের মাঝে 
সত্যিকার প্রেমিক যাঁরা, 
মরিতে বাধ্য তবুও 
প্রেম ভুলে না তাঁরা। 

বুঝেছি প্রেম আসলেই 
স্রষ্টার অতুলনীয় দান, 
তাই এক জনের প্রতি 
আরেক জনের আত্মার টান। 

কবির কোমল হৃদয় যখন প্রেমের স্পর্শে ব্যাকুল কিন্তু সমাজের নিয়ম-নীতি প্রেমের পথে কঠোর বাঁধা তখন কবি মাজেদুল হক লিখেছেন -

" বাঁশি "

মাঠের পাশে রাখাল ছেলে 
গাছের ছায়ায় বসে, 
মধুর সুরে বাজায় বাঁশি 
মন মাতানো যশে। 

পাশের গাঁয়ে একটি মেয়ে 
তাঁকেই ভালোবাসে, 
সুযোগ বুঝে সেই মেয়েটি 
তাঁরই কাছে আসে। 

এসব দেখে পাড়ার লোকে 
নানান কথা বলে, 
লোকের কথা শুনেও ওরা 
গোপন পথে চলে। 

মনের সাথে মন মিলেছে 
প্রেম হয়েছে আধা, 
চতুর্দিকে কাঁটার বেড়া 
সমাজ হলো বাঁধা। 

প্রেম যখন কবির জীবনে আশীর্বাদ হয়ে আসে কবি তখন কলেজ জীবনে অধ্যয়নরত নিজের ভবিষ্যত গড়ে তোলার তাগিদে তৎপর এমন সুযোগে কবির প্রেমিকাকে অভিভাবক জোর জবর্দস্তি করে তুলে দেয় পরের ঘরে, প্রিয়া হারানোর বিরহে, হারানো প্রিয়ার সেই প্রেমের আকুতি ব্যক্ত করতে গিয়ে কবি মাজেদুল হক লিখেন-

" অপহরণ "

মনের মিলন ছিল দু'জনের মাঝে, 
মিলেমিশে চলিতাম খেলাধুলা কাজে ;
আমায় দেখিতো যদি 
বলিতো দরদী -
তোমায় দেখিলে আমি আনন্দে বিভোর, 
মনের গহীনে বাঁশি বাজে সুমধুর। 

হাসি মুখে কাছে এসে দু'হাত বাড়িয়ে, 
বুকের সাথে আমায় ধরিতো জড়িয়ে ;
বিনয় করি তোমায় 
ভুলো না আমায়-
তোমাকে না পেলে আমি কিন্তু মরে যাবো, 
জানি না আমায় নিয়ে তুমি কিযে ভাবো। 

তাহার মাথায় রেখে আমার দু'হাত,
কসম দিয়েছে মোরে থাকিতে হায়াত ;
হয়তো ঝড় উঠিবে 
কতো কি বলিবে -
ছাড়িয়ে যাবে না মোরে দু'টি পায়ে ধরি, 
তোমার জীবন সাথী হয়ে যেন মরি। 

গোপনে অভিভাবক শাসন করিল, 
ষড়যন্ত্র করে তাকে নির্বাসন দিল ;
শুনিয়া বিবেকে বাঁধে 
এখনো সে কাঁদে-
অধ্যয়নরত আমি তখন ছিলাম, 
পরিস্থিতির কারণে কষ্টই পেলাম। 

বিধির কিযে বিধান পারি না বুঝিতে, 
প্রিয়জন কেড়ে নিলো কঠোর নীতিতে;
ব্যথার দু'টি পাহাড় 
শুধু হাহাকার -
সে কাঁদে আমিও কাঁদি ব্যথিত দু'জন, 
বিয়ের নামে হয়েছে সে অপহরণ। 

নীতিবাদী পুরুষ, প্রকৃত প্রেমিক আদর্শের পথে অটল, অপরকে দোষারোপ না করে নিজের মাঝে ত্রুটি খোঁজে নিজেকেই সংশোধন করিতে চেষ্টা করে। প্রিয়া হারানোর শোকে বিরহী কবি মাজেদুল হক নিজের ব্যর্থতা স্বীকার করতে গিয়ে লিখেন-

" ব্যর্থতা "

সবিনয়ে তুমি সামনে দাঁড়িয়ে, 
যুগল আঁখির দৃষ্টি বাড়িয়ে ;
প্রস্তাব দিলে, 
ক্ষতি কি তোমার সাথী করে নিলে  ? 

নিরুপায় আমি উত্তর দিতে, 
আশায় ছিলাম সাথী করে নিতে ;
ভয় ছিল তবু, 
শপথ রাখিতে না পারিলে কভু। 

দিবানিশি তুমি প্রহর গুনিতে, 
কি জবাব দেব নীরবে শুনিতে;
ফেলে আঁখি জল, 
সময় সুযোগে বলিতে সকল। 

ভরসা ছিল না এতটুকু মনে, 
সুদিন আসিবে আলোকিত ক্ষণে ;
বেকার ছিলাম, 
প্রেমকে জ্যান্ত করব দিলাম। 

চাকুরিটা পেয়ে আসিলাম ছুটে, 
কে যেন তোমায় নিয়ে গেল লুটে ;
বড়লোক স্বামী, 
এখন সমাজে লুটেরাই দামী। 

ব্যর্থতা এটা বলিনি ভাষায়, 
কিছুদিন তুমি থাকিও আশায় ;
লুকোচুরি খেলা, 
না পেয়ে আমায় তুমি চলে গেলা। 

প্রকৃত প্রেম কোনদিন বিলুপ্ত হয় না, সম্পর্ক ছিন্ন হলেও প্রিয়জনের নাম স্বর্ণাক্ষরে লিখা থাকে উভয়ের মনের খাতায়। দীর্ঘদিন পরে যখন দেখা হয় বিরহী মনের ব্যথাতুর কথাগুলো বলার সুযোগ হয় না তখন সেই না বলা কথাগুলো কবি মাজেদুল হক প্রকাশ করেন কবিতার ভাষায় -

" সাক্ষাৎ "

পথিক তুমি কে ? 
এভাবে চাহিলে যে আমার দিকে ! 
পরিচয় দাও চেনা প্রয়োজন, 
দেখে মনে হয় শত বছরের পরিচিত প্রিয়জন। 

মুখ তুলে চাও, 
কি বলিবে তুমি সোজা বলে যাও ;
অতীতে ছিল কি কোনো লেনাদেনা ? 
চোখে চোখ রেখে বলো অভিমান করে কিছু লুকাবে না। 

মুখোশ খুলিয়া, 
অবুঝের মতো নীরবে কাঁদিয়া ;
বলিতে লাগিল ছিল যত মনে, 
তুমি ভুলে গেছো আমিতো পারিনা নিত্য ভাসে নয়নে। 

মুখ দেখে বুঝি, 
বহুদিন পরে সে পেয়েছে খুঁজি ;
উভয়ের মনে শুধু হাহাকার, 
দু,চোখের জল মুছাবার মতো নেই আজ অধিকার। 

ইশারা করিছে, 
চলে যেতে হবে লোকটি আসিছে;
বুঝেছি লোকটি তাহার এখন, 
ধর্মের নীতি সংসার প্রীতি সবটুকু প্রয়োজন। 

থাকিতে হায়াৎ,
কভু দু'জনে কি হবে সাক্ষাৎ ? 
নিয়ে গেল তাকে নিদয়ার মত, 
সে তাকায় ফিরে তাই চেয়ে থাকি হৃদয়ে রয়েছে ক্ষত। 

প্রেমের সম্পর্ক ছিন্ন হওয়ার কারণে শুধু বিরহী কবি মাজেদুল হক একাই বিরহের অনলে পুড়ে উত্তপ্ত হয়েছেন এমন নয় কবিকে হারিয়ে কবির সেই প্রিয়াও বিরহের অনলে পুড়ে দগ্ধ হয়েছে এবং কবির বিরহে হা-হুতাশ করে কবিকে চিঠি লিখেন আর প্রিয়ার সেই চিঠি কবি কবিতার ভাষায় প্রকাশ করেন -

" নাকফুল "

আয়নায় মুখ দেখি যতবার নাকফুল চোখে পরে, 
নাকফুলে তাঁর ঝলমলে মুখ চাঁদের আলোয় ভরে। 
এই সেই স্মৃতি অমর কীর্তি আধু,
কেঁদে ওঠে মন কেউ করে নাই যাদু। 
ঐ নাকফুল তাহার দেওয়া উপহার প্রীতিময়, 
হৃদয় গগণে আলোকিত চাঁদ অমলিন হয়ে রয়। 
শিল্পীর আঁকা ক্যানভাসে সেই ছবি, 
সে তো প্রাণ প্রিয় আমার বিরহী কবি। 
কতকিছু কথা অন্তরে গাঁথা হয়তো জানে না কেউ, 
হৃদয় সাগরে পদ্মের মতো অবিকল ভাসে ঢেউ। 
কৈশোরে ছিল দু'জনের মাঝে প্রীতি, 
ভাগ্যের খেলা হয়েছে বিরহ গীতি। 
ভালো থেকো আজি প্রার্থনা মোর জীবন হল নাটক, 
এখনো তোমায় ভালোবাসি বলে হয়ে গেলাম পাঠক। 
মনের শান্তি মিলেছে তোমার কাছে, 
মনে হলে প্রাণ পাখি আনন্দে নাচে। 
হাজার বছর সাধনা করেও মিলে না এমন সুখ, 
আদর সোহাগে ভরে দিলে তুমি আমার কোমল বুক। 

প্রিয়া হারানোর ব্যথায় ব্যথিত "বিরহী কবি" শুধু প্রেম বিরহের কবিতা লিখে ক্ষান্ত হননি, তিনি সমাজের প্রত্যেক অঙ্গণের কষ্টের কথা তুলে ধরেছেন তাহার কবিতায়।
বৃদ্ধ বয়সে মা-বাবা কে অনেকেই বৃদ্ধাশ্রম পাঠায়, সেই অসহায় মা-বাবা কে নিয়ে বিরহী কবি লিখেছেন "বৃদ্ধাশ্রম" কবিতা আবার হতদরিদ্র পরিবারে সন্তান লালন পালন করিতে মা-বাবার কষ্টের বিষয় তুলে ধরেছেন তাঁর "সংকট" কবিতায়। প্রতিবন্ধী মানুষের দুঃখ,কষ্টের পরিনতি নিয়ে বিরহী কবি তাঁর "প্রতিবন্ধী " কবিতায় সুনিপুণ ভাবে উপস্থাপন করেছেন এবং বর্গাচাষীদের নিয়ে বিরহী কবি তাঁর "বর্গাচাষী " কবিতায় তুলে ধরেছেন অসহায় চাষীদের আর্তনাদের প্রতিধ্বনি। এভাবে সমাজের বিভিন্ন অসঙ্গতি তুলে ধরিতে সচেষ্ট হয়েছেন। 

বিরহী কবি মাজেদুল হক প্রথাগত ছন্দের কবিতা লেখার পাশাপাশি নিজে সৃষ্টি করেছেন নতুন কিছু ছন্দ কাঠামো আর এসব নতুন ছন্দ কাঠামোতে এনেছেন নতুনত্ব তাই নতুন ছন্দ কাঠামো বা ছন্দরীতি নিয়ে লিখেছেন-

" ছন্দরীতি "

আগে তুমি শিখে লও প্রথাগত নীতি, 
পরে কবি সৃষ্টি করো নব ছন্দরীতি। 
স্বরবৃত্ত মাত্রাবৃত্ত অক্ষরবৃত্ত টি, 
লিখিবে শুদ্ধ কবিতা না করিবে ত্রুটি।
মুক্তক অতিমুক্তক অমিত্রাক্ষর কি ? 
গৈরিশ ও গদ্যছন্দ মাত্রা বুঝে লিখি। 
অমিল সমিল সবি অন্ত্যমিলে খুঁজে, 
মাত্রা হিসেব করিয়া নিতে হবে বুঝে। 
ছন্দের নিয়মে আছে খুঁটিনাটি যত, 
ব্যাকরণ জেনে বুঝে করিবে আয়ত্ত। 
না বুঝে করিলে কিছু ফলাফল মন্দ, 
কবিতায় প্রয়োজন শিল্প গুণে ছন্দ। 
ছন্দরীতি কবিগণ করে যত সৃষ্টি, 
প্রতিভায় যোগ হবে প্রসন্ন সুদৃষ্টি। 

কবি মাজেদুল হক প্রত্যেক কবিতায় সহজবোধ্য করে লিখেছেন তারপরেও কবিতায় আছে ব্যঞ্জনা, ভাব, ছন্দালংকার, অর্থালংকার, চিত্রকল্প এসব যে পাঠক বুঝে না সে নিশ্চিত কবিতা বুঝিতে অক্ষম তাই কবি এধরণের পাঠক কে বলেছেন গণ্ডমূর্খ। প্রকৃত পক্ষে কবিতা বুঝিতে হলে কিছু কাব্যিক জ্ঞান প্রয়োজন আর সেই নুন্যতম জ্ঞান যার মাঝে নেই তাকে গণ্ডমূর্খ বলা দোষের কিছু নয়।বিরহী কবির ভাষায় -

" গণ্ডমূর্খ "

আমার কবিতা যারা মোটেও বুঝে না,
যদিও পাঠক তাঁরা কাব্য প্রেমিক না। 
ভাবার্থ বুঝিতে যেটা অতি প্রয়োজন, 
সুবুদ্ধি তাহার মাঝে হলো না অর্জন। 
নিজেকে ভাবিতে পারো বহু ভাষাবিদ, 
আমি বলি গণ্ডমূর্খ রয়েছো খরিদ। 
বুঝিতে চেষ্টা করিলে নিশ্চই পারিবে, 
সাধনায় পরিপূর্ণ অর্জন করিবে। 
চেষ্টা না করে যেজন করিবে কুতর্ক,
মূর্খ সেজো না তোমায় করেছি সতর্ক।
ব্যাকরণ জেনে বুঝে করিবে আয়ত্ত, 
সহজে কি মিলে কভু না করিলে যত্ম। 
সাধনায় মিলে বস্তু তর্কে বহুদূর, 
জ্ঞানার্জন করো যদি খুঁজো অন্তপুর। 

কাব্যিক বিবেচনায় "বিরহী কবি মাজেদুল হক" বাংলা সাহিত্যের একজন সার্থক কবি। কবির সাহিত্য চিন্তাভাবনা খুবই সুনিপুণ, প্রথাগত ছন্দের প্রতি যত্নশীল, কবির কবিতায় বিরহের আধিপত্য লক্ষনীয়। কবিতা, ছড়া, গান, উপন্যাস লিখেন, সাহিত্যের প্রত্যেক শাখায় আছে তাঁর সার্থক বিচরণ। 

মন্তব্য করুন

ব্লগ