Loading..

ব্লগ

রিসেট

২৬ ফেব্রুয়ারি, ২০২৬ ০৫:০৭ পূর্বাহ্ণ

হিটওয়েভ.............

তীব্র গরমের দিনে আপনি যখন শ্বাস নিচ্ছেন, তখন বাতাসে এমন কিছু জন্ম নিচ্ছে—যা বিজ্ঞানীরাও আগে ভাবেননি। চোখে দেখা যায় না, কিন্তু প্রভাব ফেলতে পারে আপনার শরীর আর পৃথিবীর জলবায়ুতে – হিটওয়েভের ভেতরেই বাতাসে তৈরি হচ্ছে এমন অপ্রত্যাশিত অতি ক্ষুদ্র কণা। আর এই আবিষ্কার জলবায়ু বিজ্ঞানের পুরনো ধারণাকে নাড়িয়ে দিয়েছে।


বিজ্ঞানীরা জানতেন, বাতাসে ভাসমান অতিক্ষুদ্র অ্যারোসল কণা পৃথিবীর তাপমাত্রা নিয়ন্ত্রণে বড় ভূমিকা রাখে। এরা সূর্যের আলো কতটা শোষিত হবে বা প্রতিফলিত হবে, সেটি নির্ধারণ করে। মেঘ তৈরির ক্ষেত্রেও এরা বীজের মতো কাজ করে। কিন্তু সাম্প্রতিক এক গবেষণায় দেখা গেছে, প্রচণ্ড তাপপ্রবাহের সময়—যখন তাপমাত্রা ৪০ ডিগ্রি সেলসিয়াস বা তারও বেশি—তখনও বাতাসে নতুন কণার জন্ম হচ্ছে।


এতদিন বিজ্ঞানীদের ধারণা ছিল, এত বেশি তাপে গ্যাসীয় পদার্থগুলো সহজে বাষ্পীভূত হয়ে যায়। তারা ঘনীভূত হয়ে কণায় রূপ নিতে পারে না। নতুন কণা তৈরির এই প্রক্রিয়াকে বলা হয় নিউ পার্টিকল ফরমেশন, বা সংক্ষেপে NPF। প্রচলিত তত্ত্ব অনুযায়ী, গরম যত বাড়ে, এই প্রক্রিয়া ততই দুর্বল হওয়ার কথা। কিন্তু বাস্তবতা যেন উল্টো।


মধ্য টেক্সাসে এক দীর্ঘ হিটওয়েভের সময় বিজ্ঞানীরা টানা বাতাস পর্যবেক্ষণ করেন। হঠাৎ হঠাৎ অতি ক্ষুদ্র কণার বিস্ফোরণ দেখা যায়। উন্নত মাস স্পেকট্রোমেট্রি ব্যবহার করে তারা ৩ থেকে ২৫ ন্যানোমিটার আকারের কণার রাসায়নিক গঠন বিশ্লেষণ করেন। ফলাফল স্পষ্ট। সবচেয়ে ছোট কণাগুলো মূলত তৈরি হয়েছে মাল্টিফাংশনাল কার্বক্সিলিক অ্যাসিড দিয়ে। একটু বড় কণায় আবার বেশি ছিল সালফিউরিক অ্যাসিড আর অ্যামিন।


তাহলে এত গরমে এই কণাগুলো তৈরি হলো কীভাবে? হিটওয়েভের সময় সূর্যের তীব্র বিকিরণ বাতাসে থাকা ভোলাটাইল অর্গানিক কম্পাউন্ড—যেগুলো আসে মানুষের কাজকর্ম আর প্রাকৃতিক জৈব উৎস থেকে—সেগুলোকে রাসায়নিক বিক্রিয়ার মাধ্যমে অর্গানিক অ্যাসিডে বদলে দেয়। এরপর ঘটে এক অদ্ভুত ঘটনা। এই ছোট অ্যাসিড অণুগুলো নিজেরাই একে অপরের সঙ্গে জুড়ে যায়। বিজ্ঞানীরা একে বলেন মলিকিউলার সেলফ-অ্যাসেম্বলি। হাইড্রোজেন বন্ড আর বৈদ্যুতিক আকর্ষণে ধরে ধরে তৈরি হয় ক্লাস্টার। এভাবেই জন্ম নেয় ন্যানোপার্টিকল।


কোয়ান্টাম-কেমিক্যাল হিসাব দেখিয়ে গবেষকেরা প্রমাণ করেছেন, এই প্রক্রিয়া উচ্চ তাপমাত্রাতেও স্থিতিশীল থাকতে পারে। আর এটাই পুরনো তত্ত্বকে ভেঙে দেয়। গবেষণাটি প্রকাশিত হয়েছে বিশ্বের অন্যতম মর্যাদাপূর্ণ জার্নাল Science-এ, ২০২৬ সালে।


এখানেই শেষ নয়। এই কণাগুলোর আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ বৈশিষ্ট্য আছে। এগুলো খুব কম হাইগ্রোস্কোপিক। মানে, সহজে জল টানে না। ফলে এরা মেঘ তৈরিতে তেমন দক্ষ নয়। মেঘ কম হলে কী হয়? সূর্যের আলো আরও বেশি করে পৃথিবীর পৃষ্ঠে পৌঁছায়। তাপ আরও বাড়ে। তাপ বাড়লে আবার আরও কণা তৈরি হয়। এক ধরনের বিপজ্জনক ফিডব্যাক লুপ তৈরি হয়—যা হিটওয়েভকে আরও তীব্র করে তুলতে পারে।


স্বাস্থ্যের দিক থেকেও বিষয়টি উদ্বেগজনক। ৫০ ন্যানোমিটারের চেয়ে ছোট কণা মানুষের ফুসফুসের গভীরে ঢুকে পড়তে পারে। এমনকি শরীরের অন্য অঙ্গ-প্রত্যঙ্গেও পৌঁছাতে পারে। এতে অক্সিডেটিভ স্ট্রেস আর প্রদাহ বাড়ার ঝুঁকি থাকে। অর্থাৎ তীব্র গরম শুধু অস্বস্তিকর নয়, বাতাসের মাধ্যমে নীরবে শরীরের ভেতরেও প্রভাব ফেলতে পারে।


এই নতুনভাবে শনাক্ত কণা-গঠনের পথ ভবিষ্যতের জলবায়ু মডেলকে আরও নির্ভুল করতে সাহায্য করবে বলে আশা করছেন বিজ্ঞানীরা। একই সঙ্গে, হিটওয়েভ বাড়তে থাকা পৃথিবীতে জনস্বাস্থ্য নীতিতেও এর প্রভাব পড়তে পারে।


এই গবেষণার নেতৃত্ব দেন রেনি ঝ্যাংসহ আন্তর্জাতিক একদল বিজ্ঞানী। তাদের প্রবন্ধের শিরোনাম Detecting supramolecular organic nanoparticles during heat wave। প্রকাশিত হয়েছে Science জার্নালে (২০২৬)।


তীব্র গরমের দিনে আপনি কি কখনও ভেবেছেন, শুধু তাপ নয়—বাতাসের ভেতরেও কিছু বদলে যাচ্ছে, যা আপনার শরীরের অজান্তেই প্রভাব ফেলতে পারে? এই প্রশ্নটাই আজ আমাদের সামনে দাঁড়িয়ে।


মন্তব্য করুন

ব্লগ