Loading..

ব্লগ

রিসেট

২৫ ফেব্রুয়ারি, ২০২৬ ০৯:২৪ পূর্বাহ্ণ

মানবদেহের গঠন কোনো অলৌকিক সত্তার "পরিকল্পিত ও বুদ্ধিমান নকশা"



১) আমাদের চোখের সবচেয়ে অদ্ভুত ব্যাপার হচ্ছে– আমাদের রেটিনা উল্টো করে প্রতিস্থাপিত হয়েছে। রেটিনাতে ফটো-রিসেপ্টর কোষগুলা উল্টো করে সাজানো। যেদিক থেকে চোখে আলো ঢুকে, কোষগুলো সেদিক মুখ করে সাজানো হয়নি। বরং দেখা যায় যে, আলোর দিক দিয়ে ফটোসেলের নার্ভগুলো বেরিয়ে গেছে। যার ফলে আমাদের চোখে বিশেষ ব্লাইণ্ড স্পট তৈরি হয় (যা দুই চোখের একত্রিত ফিল্ড অভ ভিজনের কারণে আমরা সহজে অনুধাবন করি না)। কিন্তু স্কুইড, অক্টোপাস ইত্যাদি প্রাণিদের আবার সঠিকভাবে সাজানো আছে, যেদিকে আলো আছে সেদিকেই তাদের ফটোসেলগুলা বিন্যস্ত করা। এই কারণে তাদের কোন ব্লাইন্ড স্পটও নেই। এছাড়া আমাদের চোখের যে ক্ষীণদৃষ্টির/দূরদৃষ্টির সমস্যা হয়, এর পিছনেও এই ভুল নকশাই মুল কারণ। পৃথিবীর প্রায় ৬–৮% পুরুষ বিশেষ এক/একাধিক রঙ বুঝতে পারে না, নারীর শতকরা হার ০.৫%।


২) মানুষের মেরুদণ্ড সোজা দাঁড়ানোর উপযোগী হলেও, মূলত এটি চারপেয়ে প্রাণীর জন্য তৈরি কাঠামো। ফলে কোমর ব্যথা, ডিস্ক প্রোল্যাপস ও স্পাইনাল সমস্যার ঝুঁকি থেকে যায়।


৩) নারীদের শ্রোনীচক্রের আকার অনেক ছোট বলে বাচ্চা প্রসবে জটিলতা তৈরি হয়। এই ছোট "Birth Canal"-এর কারণে অতীতে সুস্থ ও জীবিত বাচ্চা প্রসবের হার অনেক কম ছিলো, এখনও আফ্রিকার কিছু অনুন্নত জায়গায় এর নমুনা দেখা যায়। আধুনিক চিকিৎসার কারণে এর থেকে অনেকটা আমরা বেঁচে গেছি।


৪) মানুষের মস্তিষ্ক নিঃসন্দেহে জটিল, কিন্তু অদক্ষতাও প্রচুর। এটি প্রচুর শক্তি খরচ করে (শরীরের মোট শক্তির প্রায় ২০%) কিন্তু তথ্য প্রক্রিয়ায় ঘন ঘন ভুল করে। যেমন– Confirmation Bias, Memory Distortion, Optical illusion ইত্যাদি। প্রিফ্রন্টাল কর্টেক্স (যেখানে যুক্তি ও নৈতিক সিদ্ধান্ত হয়) পুরোপুরি পরিপক্ক হতে সময় লাগে ২৫ বছর পর্যন্ত। এটা একটা "ডিজাইন ফ্ল" বলেই ধরে নেয় বিজ্ঞানীরা। মস্তিষ্কে "অ্যাপেন্ডিক্স অব দ্য মাইন্ড" হিসেবে কিছু অপ্রয়োজনীয় অঞ্চল রয়ে গেছে, যা কোনো নির্দিষ্ট কাজ করে না।


৫) গলনালী ও শ্বাসনালী এক জায়গায় ক্রস করে গেছে, তাই আমরা সহজেই দমবন্ধ হয়ে মারা যেতে পারি। কোনো "স্মার্ট ডিজাইন" এই ঝুঁকি রাখতো না।


৬) অ্যাপেন্ডিক্স একসময় উদ্ভিদ হজমে সাহায্য করতো, এখন প্রায় অকার্যকর। বরং ইনফ্লেম হলে জীবননাশের কারণ হতে পারে।


৭) দাঁতের গঠন, বিশেষ করে "উইজডম টুথ", আজকের ছোট চোয়ালের সঙ্গে মানানসই নয়, ফলে সার্জারি করতে হয়।


৮) পুরুষের প্রোস্টেট গ্রন্থি ইউরিনারি ট্র্যাক্ট ঘিরে রাখে, যার কারণে বয়ঃবৃদ্ধিতে প্রস্রাবের সমস্যা হয়। এটি একটি মারাত্মক "ইঞ্জিনিয়ারিং ভুল"।


৯) মানবদেহে এমন অনেক অঙ্গ ও গঠন আছে, যা প্রমাণ করে আমরা অন্য প্রাণীদের থেকে বিবর্তিত হয়েছি। যেমন– টেলবোন (coccyx): আমাদের পূর্বপুরুষদের লেজের অবশেষ। গুজবাম্পস (চামড়া খাড়া হওয়া): পশুরা শরীর ফুলিয়ে নিজেকে বড় দেখাতে এই রিফ্লেক্স ব্যবহার করতো; এখন আমাদের কোনো কাজেই লাগে না। ভিটামিন 'সি' তৈরি করতে না পারা: অধিকাংশ প্রাণী নিজেরাই ভিটামিন সি তৈরি করে, মানুষ পারে না. এটি একটি জেনেটিক ত্রুটি, যা বিবর্তনের সময় ঘটে গেছে।


১০) আমাদের শরীরের সবথেকে মজার এবং হাস্যকর একটা নকশা হচ্ছে "Recurrent laryngeal nerve (RLN)", যেটা আমাদের গলা থেকে সরাসরি মস্তিস্কে না গিয়ে আমাদের হৃদপিণ্ড দিয়ে লম্বা অপ্রয়োজনীয় পথ ঘুরে এসে আবার মস্তিস্কে গিয়ে মিলিত হয়েছে।


মানবদেহের এসব ত্রুটি প্রমাণ করে– এটি কোনো "অলৌকিক সত্তার পরিকল্পনা" নয়, "নিখুঁত" নয়, বরং প্রকৃতির "ট্রায়াল অ্যান্ড এরর"-এর ফল। প্রকৃতি চেষ্টা করে না "নিখুঁত" কিছু বানাতে, বরং "যা টিকে থাকতে পারে" সেটাই রাখে। বিবর্তন হলো এক অগোছালো প্রক্রিয়া, যেখানে পুরোনো গঠনের ওপর নতুন সমাধান বসিয়ে কাজ চালানো হয়। ঠিক যেন পুরোনো সফটওয়্যারের ওপর নতুন কোড যোগ করতে গিয়ে বাগ থেকে যায়।


যদি "অলৌকিক সত্তা" সত্যিই মানুষকে নিখুঁতভাবে সৃষ্টি করতেন– তবে অন্ধ বিন্দু, অ্যাপেন্ডিক্স, দাঁতের ব্যথা, জন্মগত ত্রুটি বা ক্যান্সারের মতো ভুলগুলো থাকতো না। মানবদেহ নিঃসন্দেহে এক বিস্ময়, কিন্তু নিখুঁত নয়। এটি এক অবিশ্বাস্য বিবর্তনযাত্রার ফল, যেখানে সৌন্দর্যের সঙ্গে জড়িয়ে আছে ত্রুটি, শক্তির সঙ্গে দুর্বলতা এবং জীবনের সঙ্গে অনিবার্য অসম্পূর্ণতা।

মন্তব্য করুন

ব্লগ