Loading..

ব্লগ

রিসেট

২৪ ফেব্রুয়ারি, ২০২৬ ১০:২৩ পূর্বাহ্ণ

নাজিরশাইল চাল কি স্বাস্থ্যের জন্য ভালো?
বাংলাদেশের রান্নাঘরে নাজিরশাইল চালের নাম শুনলেই মনে পড়ে সুগন্ধি ঝরঝরে ভাতের কথা। 

দামে একটু বেশি হলেও স্বাদের জন্য অনেকেই এই চাল কিনতে পছন্দ করেন। নাজিরশাইল চালের দাম যাচাই করে ভালো মানের চাল কিনলে পরিবারের সবাই খুশি হয়। কিন্তু স্বাদের পাশাপাশি স্বাস্থ্যের বিষয়টাও জানা দরকার। 

এই চাল কি সত্যিই শরীরের জন্য উপকারী? নাকি শুধুই স্বাদের ব্যাপার?

পুষ্টিবিদ এবং বিজ্ঞান বলছে নাজিরশাইল চাল স্বাস্থ্যকর। বিশেষ করে সেদ্ধ করা চাল বেছে নিলে পুষ্টিগুণ পাবেন বেশি। এটি সহজে হজম হয়। শরীরে শক্তি জোগায়। তবে বাজারে মেশাল চাল এড়িয়ে আসল চাল চেনা জরুরি।

হজমের জন্য কেন এই চাল আদর্শ

নাজিরশাইল চালের ভাত পেটে ভারী লাগে না। সেদ্ধ প্রক্রিয়ায় রান্না করলে ভাত হালকা এবং ঝরঝরে হয়ে ওঠে। পাকস্থলীতে কোনো চাপ সৃষ্টি করে না।

এই চালে ফাইবার থাকায় হজম প্রক্রিয়া মসৃণ হয়। পেট ফাঁপা বা গ্যাসের সমস্যা কমে। অ্যাসিডিটি হওয়ার সম্ভাবনাও কম। শিশু এবং বয়স্ক মানুষদের জন্য এটি উপযুক্ত খাবার। যাদের হজমশক্তি দুর্বল তাদের জন্যও ভালো কাজ করে।

সেদ্ধ করার সময় পুষ্টি উপাদান চালের ভেতরে আটকে যায়। 

এটি অন্ত্রকে শান্ত রাখতে সাহায্য করে। শূলবেদনা বা পেটব্যথার সমস্যা দূর হয়। কম পালিশ করা নাজিরশাইলের গ্লাইসেমিক ইনডেক্স সাদা চালের তুলনায় কম। ফলে রক্তে চিনির পরিমাণ ধীরে ধীরে বাড়ে। হজম স্থিতিশীল থাকে এবং পেট ঠান্ডা অনুভব হয়।

শরীরে কী কী পুষ্টি পাবেন

নাজিরশাইল চাল ভিটামিন বি-কমপ্লেক্সের ভালো উৎস। 

এতে থায়ামিন, নিয়াসিন এবং ভিটামিন বি৬ রয়েছে। এই ভিটামিনগুলো ত্বকের উজ্জ্বলতা বাড়ায়। চুল সুস্থ রাখে এবং শরীরে শক্তি তৈরি করে। ভিটামিন ই রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা শক্তিশালী করে।

খনিজ উপাদানের দিক থেকেও এই চাল সমৃদ্ধ। আয়রন রক্তশূন্যতা দূর করতে সাহায্য করে। ম্যাগনেসিয়াম হাড় এবং স্নায়ুর জন্য প্রয়োজনীয়। পটাশিয়াম রক্তচাপ নিয়ন্ত্রণে রাখে। জিঙ্ক শরীরের রোগ প্রতিরোধ ব্যবস্থা উন্নত করে।

ক্যালসিয়াম এবং ফসফরাস হাড় মজবুত করে। ১০০ গ্রাম রান্না করা ভাতে প্রায় ১৩০ থেকে ২২০ ক্যালোরি থাকে। কার্বোহাইড্রেট পাওয়া যায় ২৮ গ্রামের মতো। 

প্রোটিন থাকে ২.৫ থেকে ৩ গ্রাম এবং ফাইবার ০.৪ থেকে ১ গ্রাম। ফ্যাট মাত্র ০.২ গ্রাম যা চালটিকে হালকা করে তোলে।

কম পালিশ করা চালে প্রোটিন এবং অ্যান্টিঅক্সিডেন্ট বেশি থাকে। সাধারণ সাদা চালের চেয়ে এটি বেশি পুষ্টিকর। গ্লুটেন-মুক্ত হওয়ায় সেলিয়াক রোগীরাও নিরাপদে খেতে পারেন।

হৃদরোগ প্রতিরোধে কীভাবে সাহায্য করে

নাজিরশাইল চালে ফ্যাটের পরিমাণ খুবই কম। কোলেস্টেরল একেবারেই নেই। এই দুটি বৈশিষ্ট্য হৃদযন্ত্রের জন্য উপকারী। পটাশিয়াম রক্তচাপ স্বাভাবিক রাখতে কাজ করে। উচ্চ রক্তচাপের ঝুঁকি কমায়।

ফাইবার শরীরের খারাপ কোলেস্টেরল কমাতে সাহায্য করে। রক্তনালী পরিষ্কার রাখে। সেলেনিয়ামের মতো অ্যান্টিঅক্সিডেন্ট হার্টের প্রদাহ কমায়। অতিরিক্ত পালিশ করা চালের মতো এতে অপ্রয়োজনীয় কার্বোহাইড্রেট নেই।

ওজন নিয়ন্ত্রণে রাখতে এই চাল কার্যকর। সঠিক ওজন বজায় থাকলে হৃদরোগের ঝুঁকি কমে। নিয়মিত খেলে হার্টের স্বাস্থ্য ভালো থাকে।

কোষ্ঠকাঠিন্যের সমস্যা কমায়

ফাইবার অন্ত্রের গতিশীলতা বাড়ায়। মলত্যাগ সহজ এবং নিয়মিত হয়। কোষ্ঠকাঠিন্যের সমস্যা দূর হয়। কোলনের বিভিন্ন জটিলতাও কমে যায়।

নিয়মিত খেলে শরীরের ডিটক্স প্রক্রিয়া সহজ হয়। ক্ষতিকর পদার্থ বের হয়ে যায়। কোলন ক্যান্সারের ঝুঁকি কমে। সেদ্ধ নাজিরশাইলের ফাইবার বিশেষভাবে কার্যকর। পেটের স্বাস্থ্য ভালো রাখতে এই চাল সাহায্য করে।

বাজারে নকল চাল চেনার উপায়

বাজারে অনেক ভেজাল নাজিরশাইল চাল পাওয়া যায়। সাধারণ মোটা চাল ছেঁটে বিক্রি করা হয়। কেমিক্যাল দিয়ে চকচকে করে নাজিরশাইল হিসেবে চালানো হয়। এতে পুষ্টি নষ্ট হয়ে যায়। গ্লাইসেমিক ইনডেক্স বেড়ে যায় ৭০ থেকে ৭৬ পর্যন্ত।

রক্তে চিনি দ্রুত বেড়ে যাওয়ার ঝুঁকি থাকে। স্বাদও নষ্ট হয়। অতিরিক্ত পালিশিংয়ে প্রোটিন ১ থেকে ২ শতাংশ কমে যায়। ফাইবার, ভিটামিন বি এবং জিঙ্ক হারিয়ে যায়। এমন চালে পোকামাকড়ও লাগে না কারণ পুষ্টি নেই।

আসল চাল চেনার কিছু লক্ষণ আছে। সুগন্ধ থাকবে স্বাভাবিক। ভাত ঝরঝরে হবে এবং লালচে আভা থাকবে। ভাত ২ থেকে ৩ ঘণ্টা পর্যন্ত নষ্ট হবে না। বিশ্বাসযোগ্য ব্র্যান্ড থেকে কিনুন যেমন এসিআই পিউর বা অস্কো। শুকনো জায়গায় সংরক্ষণ করুন। প্লাস্টিকের পাত্রে রাখলে ভালো থাকে।

ডায়াবেটিস রোগীরা কীভাবে খাবেন

ডায়াবেটিস রোগীদের জন্য অতিরিক্ত পালিশ করা নাজিরশাইল ঝুঁকিপূর্ণ। গ্লাইসেমিক ইনডেক্স বেশি থাকায় রক্তে চিনি দ্রুত বাড়ে। তবে সেদ্ধ বা আধা-ছেঁটা ভার্সন বেছে নিলে ভালো। এতে জিআই কম থাকে এবং ফাইবার বেশি থাকে।

ভাত ঠান্ডা করে খেলে উপকার পাবেন। সবজি এবং ডাল মিশিয়ে খান। লাল চালের সাথে মিশিয়ে রান্না করলে আরও নিরাপদ। পরিমাণ নিয়ন্ত্রণ করা জরুরি। একসাথে বেশি খাবেন না। ছোট ছোট অংশে ভাগ করে খান।

অন্যান্য চালের সাথে তুলনা

মিনিকেট চালের চেয়ে নাজিরশাইল বেশি পুষ্টিকর। তবে ঝরঝরে ভাবে একটু কম। কাটারি চালের তুলনায় সুগন্ধি বেশি কিন্তু ফাইবার কম। লাল চালের চেয়ে হালকা তবে অ্যান্টিঅক্সিডেন্ট কম থাকে।

কম পালিশ করা নাজিরশাইলের জিআই মাঝারি মানের। সাদা চালের উচ্চ জিআই থেকে এটি ভালো। প্রতিটি চালের নিজস্ব বৈশিষ্ট্য আছে। পরিবারের চাহিদা অনুযায়ী বেছে নিন।

সঠিক উপায়ে খাওয়ার পরামর্শ

সুষম খাদ্যতালিকার অংশ হিসেবে নাজিরশাইল চাল খান। শুধু ভাত নয় সাথে সবজি এবং প্রোটিন যোগ করুন। মাছ, ডাল এবং তরকারি মিশিয়ে খেলে সম্পূর্ণ পুষ্টি পাবেন। অতিরিক্ত খাওয়া এড়িয়ে চলুন।

প্রতিদিন তিন থেকে চার মুঠো ভাত যথেষ্ট। সেদ্ধ এবং কম পালিশ করা চাল বেছে নিন। বিশ্বস্ত দোকান থেকে কিনুন। দাম একটু বেশি হলেও মান ভালো পাবেন। সংরক্ষণের দিকে খেয়াল রাখুন। স্যাঁতসেঁতে জায়গায় রাখবেন না।

নাজিরশাইল চাল বাংলাদেশের মানুষের প্রিয় খাবার এবং তা স্বাস্থ্যকরও। সহজে হজম হয়, হৃদযন্ত্র রক্ষা করে এবং শরীরে পুষ্টি জোগায়। তবে আসল চাল চেনা এবং সঠিক প্রক্রিয়ায় রান্না করা জরুরি। কম পালিশ করা সেদ্ধ চাল বেছে নিন এবং পরিমিত পরিমাণে খান। 

সবজি ও প্রোটিনের সাথে মিশিয়ে খেলে স্বাস্থ্য সুরক্ষিত থাকবে এবং স্বাদও পাবেন পুরোমাত্রায়।


মন্তব্য করুন

ব্লগ