Loading..

ব্লগ

রিসেট

২২ ফেব্রুয়ারি, ২০২৬ ০২:২৯ অপরাহ্ণ

বৃত্তি পরীক্ষার উত্তরপত্রে মূল্যায়নের ক্ষেত্রে নিরীক্ষণকারী দায়িত্বে যখন....

বৃত্তি পরীক্ষার উত্তরপত্র মূল্যায়নে নিরীক্ষণকারীর দায়িত্ব


পঞ্চম শ্রেণির শিক্ষার্থীদের বৃত্তি পরীক্ষার উত্তরপত্র মূল্যায়ন একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ও দায়িত্বশীল কাজ। আর এই মূল্যায়ন প্রক্রিয়া সঠিকভাবে সম্পন্ন হচ্ছে কিনা তা তদারকি করা— সেটিই হলো নিরীক্ষণকারীর (Scrutinizer/Moderator) প্রধান দায়িত্ব। আসুন এই দায়িত্বের বিভিন্ন দিক নিয়ে আলোচনা করি।


মূল্যায়নকেন্দ্রের পরিবেশ


বৃত্তি পরীক্ষার খাতা মূল্যায়নের জন্য সাধারণত কয়েকটি কেন্দ্র স্থাপন করা হয়। সেখানে দেশের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে শিক্ষকরা এসে খাতা মূল্যায়ন করেন। বিশাল হলঘর জুড়ে সারি সারি টেবিল, প্রতিটি টেবিলে খাতার স্তূপ, আর শিক্ষকরা মনোযোগ দিয়ে খাতা দেখছেন— এমন চিত্র চোখে পড়ে।


নিরীক্ষণকারীর প্রধান দায়িত্বসমূহ


১. মূল্যায়ন প্রক্রিয়ার তদারকি


· মূল্যায়নকারী শিক্ষকরা সঠিক নিয়মে খাতা মূল্যায়ন করছেন কিনা দেখা

· কোনো খাতা অমূল্যায়িত পড়ে আছে কিনা খেয়াল রাখা

· মূল্যায়নের গতি ও মান উভয়ই ঠিক রাখা


২. নম্বর বণ্টনের সঠিকতা যাচাই


· প্রতিটি প্রশ্নের জন্য নির্ধারিত নম্বর ঠিকমতো দেওয়া হচ্ছে কিনা দেখা

· কোনো প্রশ্ন অমূল্যায়িত থেকে যাচ্ছে কিনা খেয়াল করা

· যোগফল সঠিক হচ্ছে কিনা নমুনা যাচাই করা


৩. অসঙ্গতি নিরসন


· কোনো খাতায় অস্বাভাবিকভাবে কম বা বেশি নম্বর দেখলে সেটি পুনর্মূল্যায়নের ব্যবস্থা করা

· মূল্যায়নকারীদের মধ্যে নম্বর প্রদানের ক্ষেত্রে সামঞ্জস্য বজায় রাখা

· কোনো সমস্যা দেখা দিলে তাৎক্ষণিক সমাধান করা


মূল্যায়নকেন্দ্রের মজার কিছু দৃশ্য


খাতার ভেতরের গল্প


পঞ্চম শ্রেণির শিক্ষার্থীদের খাতা দেখতে গিয়ে অনেক মজার ঘটনা ঘটে। যেমন:


একটি খাতায় বিজ্ঞানের প্রশ্নের উত্তরে লেখা: "সূর্য পূর্ব দিকে ওঠে কারণ ওর পশ্চিম দিকে যেতে ভালো লাগে না!"


আরেকটি খাতায় বাংলা রচনায় লেখা: "আমার প্রিয় শিক্ষক স্যার এত ভালো যে, উনি কখনো বেত মারেন না। উনি শুধু চড় মারেন!"— পড়ে মূল্যায়নকারী শিক্ষক হাসি থামাতে পারেননি।


একটি খাতায় অংকের অঙ্ক কষতে গিয়ে ছবি এঁকে দিয়েছে! প্রশ্ন ছিল একটি আয়তক্ষেত্রের ক্ষেত্রফল বের করতে, আর ছাত্রটি আয়তক্ষেত্রের ভেতর দরজা-জানালা এঁকে দিয়েছে!


মূল্যায়নকারীদের অবস্থা


দীর্ঘক্ষণ খাতা দেখতে দেখতে শিক্ষকদের মধ্যে মজার সব অবস্থা হয়। কেউ চোখ টিপে টিপে খাতা দেখেন, কেউ মাঝরাতে চা খেয়ে খাতা দেখেন। একজন শিক্ষক বলছিলেন, "রাতে স্বপ্নে দেখি, পুরো খাতা জুড়ে শুধু ০ আর ১০০ নম্বর ঘুরছে!"


হঠাৎ বিতর্ক


দুইজন মূল্যায়নকারীর মধ্যে একটি খাতার নম্বর নিয়ে তর্ক বেধে গেল। একজন বলছেন, "এটা ৫ নম্বর পাবে।" অন্যজন বলছেন, "না, এটা ৩-এর বেশি না।" শেষ পর্যন্ত নিরীক্ষণকারী এসে খাতাটি দেখে মীমাংসা করলেন। পরে দেখা গেল, উভয়েই একই নম্বর দিতে চাচ্ছিলেন, কিন্তু গণনার ভুল ছিল!


নিরীক্ষণকারীর চ্যালেঞ্জ


চোখ ও মাথার ক্লান্তি


ঘণ্টার পর ঘণ্টা খাতা দেখতে দেখতে চোখ ও মাথায় চাপ পড়ে। নিরীক্ষণকারী হিসেবে নিজেও তো খাতা দেখতে হয়, আবার অন্যদের কাজও মনিটর করতে হয়।


সময়ের চাপ


সাধারণত বৃত্তি পরীক্ষার ফলাফল দ্রুত প্রকাশ করতে হয়। তাই সময়ের মধ্যে মূল্যায়ন শেষ করার চাপ থাকে।


বৈচিত্র্যময় মান


একই প্রশ্নের উত্তরে বিভিন্ন শিক্ষার্থীর বিভিন্ন ধরনের উত্তর। কোনটা কত নম্বর পাবে— তা নির্ধারণ করা কঠিন হয়ে পড়ে মাঝে মাঝে।


অভিভাবকদের প্রত্যাশা


অভিভাবকরা সন্তানের ভালো ফল চান। কিন্তু মূল্যায়ন করতে গেলে বাস্তবতাই মানতে হয়। এই চাপও কাজ করে।


মূল্যায়ন পরবর্তী কাজ


খাতা মূল্যায়ন শেষ হলে নিরীক্ষণকারীর দায়িত্ব শেষ হয়ে যায় না। তখন শুরু হয়:


· সব খাতার নম্বর তালিকাভুক্ত করা

· কম্পিউটারে ডাটা এন্ট্রির সময় তদারকি করা

· কোনো খাতা বাদ পড়েছে কিনা দেখা

· মূল্যায়নকেন্দ্র থেকে খাতা জমা দেওয়ার ব্যবস্থা করা


কিছু স্মরণীয় মুহূর্ত


একবার একটি খাতা দেখে সবাই অবাক! একটি ছাত্র সমস্ত প্রশ্নের উত্তর এত সুন্দরভাবে লিখেছে যে, মূল্যায়নকারী বললেন, "এটা কি সত্যিই পঞ্চম শ্রেণির ছাত্রের খাতা?" পরে খোঁজ নিয়ে দেখা গেল, ছাত্রটি অত্যন্ত মেধাবী এবং তার বাবা-মা উভয়ই শিক্ষক।


আরেকবার একটি খাতায় শেষ পৃষ্ঠায় লেখা ছিল: "ম্যাডাম, আপনি যদি আমার খাতা দেখেন, তাহলে দয়া করে আমাকে ৮০% এর বেশি দেবেন। আমি নতুন বাইক চাই!"— পড়ে পুরো মূল্যায়নকেন্দ্র হাসিতে ফেটে পড়ল।


একটি ঘটনা মনে পড়ে, এক মূল্যায়নকারী একটি খাতা দেখে বললেন, "এই ছাত্রের হাতের লেখা এত সুন্দর যে, খাতায় নম্বর কাটতে ইচ্ছে করে না!" কিন্তু পরে দেখা গেল, সব উত্তরই ভুল!


শেষ কথা


বৃত্তি পরীক্ষার উত্তরপত্র মূল্যায়নের সময় নিরীক্ষণকারীর দায়িত্ব শুধু একটি প্রাতিষ্ঠানিক কাজ নয়, এটি এক ধরনের সেবা। ছোট ছোট মেধাবীদের ভবিষ্যৎ গড়ার অংশীদার হওয়ার আনন্দ এখানে। ক্লান্তি আসে, কিন্তু যখন দেখেন, একটি ছাত্রের সঠিক মূল্যায়নের মাধ্যমে তার সঠিক ফলাফল নিশ্চিত হচ্ছে, তখন মনে হয় এই কষ্ট সার্থক।



উল্লেখ্যঃ ছবিতে আমি  দায়িত্বরত নিরীক্ষক হিসেবে পিটিআই রংপুর, হলরুমে।

সাথে বিভিন্ন উপজেলার পরীক্ষকের দায়িত্বে ওনারা।



মন্তব্য করুন

ব্লগ